ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে, দাবি ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪০ বার
ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ দাবি

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে, ঠিক সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনাও আপাতত স্থগিত রয়েছে। বুধবার ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই দাবি করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি এমন তথ্য পেয়েছেন যে ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রস্তুতিও আপাতত নেই। তবে এই তথ্য তিনি কার কাছ থেকে পেয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। শুধু এটুকু উল্লেখ করেন, তিনি ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র’ থেকে এই তথ্য পেয়েছেন, যা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়েছে। প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, এই ইস্যুতে যারা কাজ করছেন, তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সময়মতো একটি “ভালো বিবৃতি” দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি। তার ভাষায়, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, সেটি দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও সরকারের কঠোর দমননীতির খবর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা চলছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও পশ্চিমা দেশগুলো এর আগেই ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, গণগ্রেপ্তার এবং মৃত্যুদণ্ডের হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ‘হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে’—এমন দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এর মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এসেছে। বুধবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তিনি দাবি করেন, ইরান সরকার আইনের শাসনের মধ্যে থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে এবং যেসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে উঠছে, তার অনেকগুলোই অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর।

ইরানের এই বক্তব্য এবং ট্রাম্পের দাবিকে একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের মাঝেও উভয় পক্ষই এখনো কূটনৈতিক ভাষায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে।

ইরানে সাম্প্রতিক আন্দোলনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, উচ্চ বেকারত্ব এবং ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে অবমূল্যায়নের কারণে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েল বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান নেমে এসেছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫-এ। অর্থাৎ, ইরানে এখন এক ডলার কিনতে প্রয়োজন প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ইরানি রিয়েল। এই ভয়াবহ অবমূল্যায়নের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা—সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ জমতে জমতেই তা রূপ নিয়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলনে।

এই আন্দোলন দমনে ইরান সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ, গ্রেপ্তার এবং কঠোর শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। ফলে ট্রাম্পের ‘হত্যা বন্ধ হয়েছে’—এমন বক্তব্য অনেকের কাছেই আশার আলো হিসেবে দেখা দিলেও, অনেকেই এটিকে এখনো যাচাইযোগ্য দাবি হিসেবে বিবেচনা করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পেছনে রাজনৈতিক কৌশলও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব, ইরান ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন—সবকিছু মিলিয়েই এমন বক্তব্য দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর একটি কৌশলও হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। তাদের মতে, বাস্তব চিত্র জানতে হলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন প্রয়োজন। যতক্ষণ না মাঠপর্যায়ে সহিংসতা ও দমননীতি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলা যাবে না।

ইরানের ভেতরে সাধারণ মানুষের মনোভাবও এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। একদিকে তারা অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত, অন্যদিকে রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে রয়েছে ভয় ও উদ্বেগ। ট্রাম্পের বক্তব্য যদি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তাহলে তা ইরানের সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে। তবে এখনো সেই আশ্বাস বাস্তবতায় কতটা রূপ নেবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সব মিলিয়ে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হওয়ার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এটি সত্যিই মাঠপর্যায়ের পরিবর্তনের ইঙ্গিত, নাকি কেবল কূটনৈতিক ভাষ্য—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নিশ্চিতভাবেই ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতেও বিশ্বরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।

এই সংবাদটি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত তথ্য, আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং অনলাইন তথ্য-উপাত্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে। সংবাদ পরিবেশনে পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে মানবিক ও পাঠক-আকর্ষণীয় উপস্থাপনার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত