প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুই বছর পর আবারও ফিরছে যুব ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ছেলেদের যুব বিশ্বকাপ ক্রিকেট, যেখানে আগামী প্রজন্মের তারকারা নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ার যৌথ আয়োজনে ১৫ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট। ক্রিকেটপ্রেমী দেশগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা এই আসরে বাংলাদেশসহ মোট ১৬টি দল অংশ নিচ্ছে, যারা যুব ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য লড়াই করবে।
বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে দুদিন পর। ২০২০ সালের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল প্রথম ম্যাচ খেলবে ১৭ জানুয়ারি, শনিবার। বুলাওয়ের কুইন্স স্পোর্টস ক্লাবে ‘বি’ গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে টাইগার যুবারা মুখোমুখি হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দলের। বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশ-ভারত লড়াই মানেই বাড়তি উত্তেজনা, আর সেটি যদি হয় প্রথম ম্যাচে, তাহলে চাপ ও রোমাঞ্চ দুটোই বাড়ে বহুগুণ।
এই বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং নিজেদের সামর্থ্য নতুন করে প্রমাণ করার এক বড় সুযোগ। ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। সেই সাফল্য দেশের ক্রিকেটে নতুন আত্মবিশ্বাস এনে দেয় এবং যুব পর্যায়ে বাংলাদেশকে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে এরপরের দুটি বিশ্বকাপে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গেলেও ২০২৪ আসরে সুপার সিক্স থেকেই বিদায় নিতে হয় দলটিকে। ফলে এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন আছে, তেমনি আছে নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জও।
‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গে রয়েছে ভারত, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। কাগজে-কলমে এই গ্রুপকে বলা যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ভারত ও নিউজিল্যান্ড বরাবরই যুব ক্রিকেটে শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক দুর্বল হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের ক্রিকেটের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। ফলে প্রতিটি ম্যাচেই বাংলাদেশকে খেলতে হবে পূর্ণ মনোযোগ ও পরিকল্পনা নিয়ে।
গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচ ২০ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, সেটিও বুলাওয়েতেই। এই ম্যাচটি সুপার সিক্সে ওঠার দৌড়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এরপর ২৩ জানুয়ারি হারারেতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। এই তিন ম্যাচের ফলই নির্ধারণ করবে গ্রুপে বাংলাদেশের অবস্থান এবং পরবর্তী পর্বের পথচলা কতটা মসৃণ হবে।
টুর্নামেন্টের ফরম্যাট অনুযায়ী, প্রথম পর্বে চারটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ তিনটি করে মোট ১২টি দল সুপার সিক্সে উঠবে। সুপার সিক্সে দলগুলো আবার দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে। বাংলাদেশ যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী ‘বি’ গ্রুপ থেকে সুপার সিক্সে ওঠে, তাহলে তারা পড়বে এমন একটি গ্রুপে যেখানে থাকবে ‘সি’ গ্রুপ থেকে আসা তিনটি দল। এই পর্বে প্রতিটি ম্যাচই হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রথম পর্বে সুপার সিক্সে ওঠা দলগুলোর বিপক্ষে অর্জিত পয়েন্ট ও নেট রান রেট বহাল থাকবে।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে গ্রুপ পর্বে অবস্থান নির্ধারণ। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে সুপার সিক্সে তুলনামূলক অনুকূল প্রতিপক্ষ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় হলে কঠিন সমীকরণের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই প্রথম ম্যাচ থেকেই সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কোচিং স্টাফ ও সাবেক ক্রিকেটাররা।
এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ার কন্ডিশন অনেকটাই আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলের মতো। সেখানে পিচে শুরুতে বাউন্স ও গতি থাকতে পারে, আবার সময়ের সঙ্গে স্পিনারদেরও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের যুব দলের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা, কারণ এই কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার হিসেবে তাদের প্রস্তুতির মানও তুলে ধরবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলটি বিশ্বকাপের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। অনুশীলন ম্যাচ, ফিটনেস ক্যাম্প এবং কৌশলগত প্রস্তুতির মাধ্যমে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। দলের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ব্যাটার ও বোলার রয়েছেন, যাদের ওপর বড় ম্যাচে ভরসা রাখছে টিম ম্যানেজমেন্ট।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি মানসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ম্যাচে ভালো শুরু করতে পারলে পুরো টুর্নামেন্টে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিপরীতে প্রথম ম্যাচে হারলে চাপ বেড়ে যাবে পরের ম্যাচগুলোতে। তাই শুরুতেই শক্ত প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় কৌশলগত ক্রিকেট খেলতে হবে বাংলাদেশকে।
বিশ্বকাপ মানেই শুধু ট্রফির লড়াই নয়, বরং ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের খুঁজে পাওয়ার মঞ্চ। অতীতে এই টুর্নামেন্ট থেকেই উঠে এসেছেন বহু তারকা ক্রিকেটার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎ জাতীয় দলের জন্য নতুন মুখ তুলে আনার সম্ভাবনা তৈরি করছে। তরুণ ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে বাংলাদেশের ক্রিকেট কতটা শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে আজ থেকে শুরু হওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখার উপলক্ষ। প্রথম ম্যাচেই ভারতের মতো শক্ত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়া যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণেরও বড় সুযোগ। মাঠে নামার আগে তরুণ টাইগারদের কাঁধে ভর করে আছে দেশের কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশা। তারা চাইছে ২০২০ সালের সেই গৌরবময় অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি, কিংবা অন্তত লড়াকু পারফরম্যান্সে ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো জ্বালিয়ে রাখা।