ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নে ধস, উন্নয়ন গতি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১১ বার
ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নে ধস, উন্নয়ন গতি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন

প্রকাশ: ১৫  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ১৮ শতাংশের নিচে নেমে আসায় দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি এতটাই মন্থর ছিল যে, অতিমারি করোনাকালেও এমন চিত্র দেখা যায়নি। অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, এই ধীরগতির প্রভাব শুধু চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর রেশ আগামী কয়েক বছর ধরে দেশের অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অনুভূত হতে পারে।

আইএমইডির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এডিপির আওতায় ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪১ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে উন্নয়ন ব্যয় ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি, সেখানে এবার ব্যয় কমেছে প্রায় ৮ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। শতাংশের হিসেবে বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশেরও কমে, যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উন্নয়ন কার্যক্রমের এই স্থবিরতা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ব্যয়ে সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। করোনা মহামারির অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে গিয়ে সরকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেয়। এর ফলে গত চার বছর ধরেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি তুলনামূলক ধীর। তবে চলতি অর্থবছরে এসে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে অর্থবছরের প্রথমার্ধে যে হারে প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা হয়নি।

আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, একক মাস হিসেবে গত ডিসেম্বরের ব্যয় আগের বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও সামগ্রিক চিত্রে তা আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই মাসে ছিল ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চলতি অর্থবছরের এডিপির মোট আকার আগের বছরের তুলনায় ছোট। ফলে টাকার অঙ্কে ব্যয় কম হলেও শতাংশের হিসেবে কিছুটা বেশি দেখাচ্ছে। বাস্তবে গত ডিসেম্বরে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ১৩ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের ডিসেম্বরে ব্যয় হয়েছিল ১৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা।

এই মন্থর বাস্তবায়নের পেছনে সরকারিভাবে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে সংশোধিত এডিপি অনুমোদনের পর পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় সংস্কার উদ্যোগ ছিল সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো। এর অংশ হিসেবে শতভাগ টেন্ডার ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট বা ইজিপি পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই নতুন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে গিয়ে অনেক প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগছে, ফলে বাস্তবায়নও ধীর হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প অনুমোদনের ছয় মাস পর বাস্তবায়নের গুণগত মান নিয়ে প্রতিবেদন দিতে হয়। এর ফলে প্রকল্প পরিচালকরা তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু করার পরিবর্তে মান বজায় রাখার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, যা স্বল্পমেয়াদে ব্যয়ের গতি কমিয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব ছেড়ে চলে যান বা অনুপস্থিত থাকেন। নতুন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও দায়িত্ব হস্তান্তরে সময় লাগায় প্রকল্প কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

সরকার বর্তমানে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে নিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা। যেসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বা অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বা স্থগিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরটি নির্বাচনের বছর হওয়ায় অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আগের মতো বড় অঙ্কের বরাদ্দ চায়নি। এসব সবকটি কারণ মিলিয়ে এডিপি বাস্তবায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে সংশোধিত এডিপিতে। উন্নয়ন ব্যয়ের হতচিত্রের কারণে মূল এডিপি থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাঁটাই করা হয়েছে। ফলে সংশোধিত এডিপির আকার নেমে এসেছে দুই লাখ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরে মোট এক হাজার ১৯৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের আওতায় রয়েছে, যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রকল্পসংখ্যা।

আইএমইডির বিশ্লেষণে খাতভিত্তিক বাস্তবায়নের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বাস্তবায়ন হার মাত্র ২ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়; তাদের বাস্তবায়ন হার ৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত খাতগুলোতেই প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি সবচেয়ে ধীর। উন্নয়ন বিশ্লেষকরা বলছেন, এই খাতগুলোর দুর্বল বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার ১০ শতাংশেরও কম, যা অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১২ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ ১৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। এসব খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ না হওয়ায় ব্যয় বাড়ছে, পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত সুফলও বিলম্বিত হচ্ছে।

তবে এই হতাশাজনক চিত্রের মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এডিপি বরাদ্দের ৩৬ শতাংশ ব্যয় করে বাস্তবায়নে শীর্ষে রয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও ৩১ শতাংশের বেশি ব্যয় করতে পেরেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের বাস্তবায়ন হার প্রায় ৩১ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও শীর্ষ পাঁচে রয়েছে, যাদের বাস্তবায়ন হার যথাক্রমে ২৮ ও ২৩ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, উন্নয়ন ব্যয়ের এই ধীরগতি সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারি উন্নয়ন ব্যয় সাধারণত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখে। এডিপি বাস্তবায়ন কম হলে বেসরকারি বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাঁদের মতে, স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি, তবে সেই সঙ্গে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত সংস্কারের সুফল পেতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে এডিপি বাস্তবায়নের এই নিম্নগতি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত। সরকার যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে বছরের বাকি সময়েও এই ধীরগতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে। আর এর প্রভাব পড়বে সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনমান ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত