প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাঁচ দিনের সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা—এই পরিচিত কর্মজীবনের ছকটি কি ইতিহাসের পাতায় চলে যেতে বসেছে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নটি এখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। ২০২৫ সালে এসে এআইয়ের বিস্ফোরক উন্নয়ন শুধু চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগই তৈরি করেনি, বরং জন্ম দিয়েছে এক আশাবাদী কল্পনারও—প্রযুক্তি যদি মানুষের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে কি সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করাই আর প্রয়োজন হবে?
একসময় শিল্পবিপ্লব মানুষের কর্মঘণ্টা কমিয়েছিল। কারখানায় কাজের সময় সীমিত হয়েছে, শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ শতকে আট ঘণ্টা কর্মদিবসকে সভ্যতার বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই সময় এসে এআই ও অটোমেশনের উত্থান সেই অর্জনের পরবর্তী ধাপের কথা ভাবতে বাধ্য করছে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—মানুষ কি আবারও কাজের সময় কমানোর এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে?
এই আলোচনার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা। এআই এখন শুধু তথ্য বিশ্লেষণ বা সাধারণ স্বয়ংক্রিয় কাজেই সীমাবদ্ধ নয়। লেখালেখি, ডিজাইন, কোডিং, চিকিৎসা নির্ণয়, আইনি গবেষণা—এমন বহু ক্ষেত্রে এআই মানুষের কাজের বড় অংশ নিজেই করতে পারছে। ফলে একটি কাজ সম্পন্ন করতে যে সময় আগে লাগত, এখন তার অনেক কম সময়ই যথেষ্ট। উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, কিন্তু সেই বাড়তি সময় মানুষ কীভাবে ব্যবহার করবে—এটাই বড় প্রশ্ন।
বিশ্বের প্রভাবশালী প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য এই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এ বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে মত দিয়েছেন। তিনি শুধু চার দিনের কর্মসপ্তাহ নয়, বরং ভবিষ্যতে দুই বা তিন দিনের কর্মসপ্তাহের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। গেটসের মতে, এআই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে অনেক কাজেই মানুষের সরাসরি উপস্থিতি প্রয়োজন হবে না। মানুষ তখন কাজের বাইরে নিজের জীবন, পরিবার, সৃজনশীলতা ও সমাজের জন্য বেশি সময় দিতে পারবে। ২০২৩ সালেই তিনি বলেছিলেন, হয়তো এমন এক সময় আসবে, যখন সপ্তাহে তিন দিন কাজ করাই যথেষ্ট হবে।
এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং তুলনামূলকভাবে সতর্ক আশাবাদী। তিনি স্বীকার করেন, এআই প্রায় সব ধরনের কাজেই প্রভাব ফেলবে এবং চার দিনের কর্মসপ্তাহ ‘সম্ভবত’ বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, নতুন প্রযুক্তি অনেক সময় মানুষকে আরও ব্যস্তও করে তুলতে পারে। কারণ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে নতুন দায়িত্ব, নতুন দক্ষতা ও নতুন চাপ তৈরি হয়। মজার বিষয় হলো, হুয়াং নিজেই সপ্তাহে সাত দিন ভোর চারটা থেকে কাজ শুরু করেন। তাঁর বক্তব্য যেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যকার দ্বন্দ্বটিই তুলে ধরে।
এই আলোচনায় সবচেয়ে দূরদর্শী কিংবা বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন ইলন মাস্ক। টেসলা ও স্পেসএক্সের এই সিইও মনে করেন, আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এআই ও রোবোটিকস এমন স্তরে পৌঁছাবে, যেখানে মানুষের জন্য কাজ করা ঐচ্ছিক হয়ে যাবে। তাঁর কল্পনায় এমন এক ভবিষ্যৎ আছে, যেখানে দারিদ্র্য থাকবে না, আয় হবে সর্বজনীন এবং কাজের জন্য শহরে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকার প্রয়োজনও পড়বে না। মাস্কের এই ধারণা অনেকের কাছে কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও, প্রযুক্তির বর্তমান গতি দেখলে একে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও কঠিন।
তবে এই আলোচনা শুধু তাত্ত্বিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তব দুনিয়াতেও চার দিনের কর্মসপ্তাহ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। জাপানের টোকিও মহানগর সরকার ইতিমধ্যে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। এর লক্ষ্য শুধু কর্মীদের সুখ নয়, বরং কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানো এবং কর্মীদের মানসিক চাপ কমানো। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কোম্পানি শুক্রবারকে ‘ফ্লেক্সিবল ডে’ হিসেবে দেখছে, যেখানে কর্মীরা চাইলে কাজ করবেন, না চাইলে বিশ্রাম নেবেন। এসব উদ্যোগে অনেক প্রতিষ্ঠানই লক্ষ্য করছে, কাজের সময় কমলেও উৎপাদনশীলতা কমছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েই যাচ্ছে।
পারফরম্যান্স কোচিং প্রতিষ্ঠান এক্সোসের অভিজ্ঞতাও আশাব্যঞ্জক। তারা জানাচ্ছে, চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালুর পর কর্মীরা আরও উদ্যমী হয়ে কাজে ফিরছেন। দীর্ঘ সপ্তাহান্ত কর্মীদের মানসিক পুনরুদ্ধারে সাহায্য করছে, ফলে তারা কম সময়ে আরও মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারছেন। এতে প্রতিষ্ঠানের লাভও কমছে না, বরং কর্মী ধরে রাখার হার বাড়ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তন সবার জন্য একরকম হবে না। সব খাতেই এআই একইভাবে প্রভাব ফেলবে না। প্রযুক্তিনির্ভর সাদা-কলার পেশায় কর্মঘণ্টা কমানো তুলনামূলক সহজ হলেও, উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা বা সেবামূলক খাতে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—যদি কাজের সময় কমে, তবে মজুরি কীভাবে নির্ধারিত হবে? কম কাজ মানে কি কম আয়, নাকি উৎপাদনশীলতা বাড়ায় আয় একই থাকবে?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈষম্য। এআইয়ের সুফল যদি কেবল বড় করপোরেশন বা উন্নত দেশগুলোই পায়, তবে বিশ্বব্যাপী কর্মবাজারে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একদিকে কম কাজের সুযোগ মানে হতে পারে বেকারত্ব, অন্যদিকে সঠিক নীতির মাধ্যমে এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগও তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যুগে কর্মসপ্তাহ ছোট হওয়া অনিবার্য নয়, তবে সম্ভাবনাময়। এটি নির্ভর করবে সরকার, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ কীভাবে এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগায় তার ওপর। যদি এআইয়ের ফলে উৎপাদনশীলতার সুফল সবার মধ্যে ন্যায্যভাবে বণ্টন করা যায়, তাহলে চার দিনের কর্মসপ্তাহ বা কম কাজের সময় বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। আর যদি সেই সুফল কেবল কিছু গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে কাজের সময় কমার বদলে চাপ ও অনিশ্চয়তা বাড়তেও পারে।
সব মিলিয়ে এআই যুগ শুধু কাজের ধরন নয়, কাজের দর্শনকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মানুষ কি শুধুই কাজ করার জন্য জন্মেছে, নাকি কাজ মানুষের জীবনের একটি অংশমাত্র? প্রযুক্তির এই অগ্রগতি আমাদের সামনে সেই মৌলিক প্রশ্নটাই নতুন করে তুলে ধরছে। কর্মসপ্তাহ ছোট হবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—এআই যুগে আমরা কাজ ও জীবনের ভারসাম্য কীভাবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করব।