গদখালীর ফুলচাষিরা: নির্বাচন-উৎসবে সম্ভাবনা ও শঙ্কার ছায়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১১ বার
গদখালীর ফুলচাষিরা: নির্বাচন-উৎসবে সম্ভাবনা ও শঙ্কার ছায়া

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যশোরের গদখালী অঞ্চল তার বর্ণিল ফুলের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো উৎসবগুলোকে সামনে রেখে এখানকার হাজার হাজার ফুলচাষি দিনরাত পরিশ্রম করছেন। মাঠজুড়ে ফুটে থাকা গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস এবং জারবেরার রঙিন সমারোহে যেন প্রকৃতিই তাদের উদ্দীপনার সঙ্গে সাড়া দিচ্ছে। তবে এই উৎসবমুখর মৌসুমের মাঝেও চাষি ও ব্যবসায়ীদের মনে দুশ্চিন্তার ছায়া বিরাজ করছে। তারা আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ না হলে কিংবা বাজার পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলে তাদের সঞ্চিত শ্রম ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগের ক্ষতি হতে পারে।

গদখালীর ফুলচাষিরা জানাচ্ছেন, নির্বাচনের দিন এবং উৎসবের প্রধান দিনগুলো একসঙ্গে আসায় চাহিদা ও বিক্রির হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় চাষি আজিজুর রহমান বলেন, মাঠে পর্যাপ্ত ফুল রয়েছে এবং আবহাওয়াও অনুকূলে। তিনি আশাবাদী যে নির্বাচন এবং উৎসব একসঙ্গে হলেও ফুলের চাহিদা বাড়বে এবং দামও ভালো পাওয়া সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে গোলাপ প্রতি পিস মাত্র তিন টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু উৎসব ও নির্বাচনের কারণে তা ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে, বাজারে মূলদিনে যদি কোনো রাজনৈতিক গোলযোগ ঘটে অথবা পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, তাহলে পুরো মৌসুমের পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে।

অন্য একজন ফুলচাষি মঞ্জুর আলম জানান, প্রতি বছর বসন্ত, ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বাজারের জন্য চাষিরা আগেই প্রস্তুতি নেন। এই সময়ই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এবং বছরের লাভ-লোকসানের হিসাবও মেলে। তবে চলতি বছরে তিনটি বড় উৎসবের সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন যুক্ত হওয়ায় চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও, বাজার স্থিতিশীল থাকবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে এবং পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে গদখালীর ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ ফুল বিক্রি হতে পারে। অন্যথায়, পরিস্থিতির অবনতি হলে তা চাষিদের জন্য বড় লোকসানের কারণ হবে।

গদখালী ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমের শুরু থেকে বাজারের পরিস্থিতি ভালোই আছে। আবহাওয়াও অনুকূলে রয়েছে এবং মাঠে প্রচুর ফুল রয়েছে। এজন্য চলতি মৌসুমে শতকোটি টাকার বেশি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে কি না, তা অনিশ্চয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হওয়ায় অনেক অনুষ্ঠান সীমিত আকারে হবে। এর ফলে ফুলের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে এবং বাজারের স্থিতিশীলতা প্রভাবিত হতে পারে।

ফুলচাষিদের দুশ্চিন্তার পেছনে শুধু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই দায়ী নয়। বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসের বাজার সাধারণত ১০ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থির থাকে। কিন্তু এবারের নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি হওয়ায় বাজারের প্রধান দিনগুলোতে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া ১১ ফেব্রুয়ারি বাজার কতটা জমবে, তা নিয়েও চাষিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও রমজানের শুরু হওয়ায় উৎসবের মৌসুমের দৈর্ঘ্য কমে যাচ্ছে। এসব কারণে চাষিদের জন্য লাভ-লোকসানের হিসাব করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যশোর অঞ্চলে প্রায় সাত হাজার চাষি ৬৪১ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করেন। এখানে ১৩ ধরনের ফুলের বাণিজ্যিক চাষ হয়, যা দেশের মোট ফুলের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করে। গদখালীর ফুলচাষীরা শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দিক থেকেও দেশের উৎসবমুখর পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ফুলের সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎসবগুলোতে সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের মতে, সম্ভাবনা ও শঙ্কার এই দ্বিধার মাঝেই তারা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। তারা আশাবাদী যে রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল থাকলে, বাজার সচল থাকলে এবং পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে এই বছরের বাজার আগের বছরের চেয়ে আরও সফল হতে পারে। তবে এই সময়ের যে কোন অনিশ্চয়তা, যেমন রাজনৈতিক গোলযোগ, আবহাওয়া বা রমজানের প্রভাব, তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সর্বশেষ, গদখালীর ফুলচাষিরা এই মৌসুমে ভালো দাম পাওয়া এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দৃঢ়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা জানাচ্ছেন, মাঠ ও গ্রীনহাউসে ফুলের যত্ন যথাযথভাবে চলছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং চাষি কমিটির সমন্বয়ে তারা চেষ্টা করছেন যে, সকল ঝুঁকি মোকাবেলা করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হবে। ফলে উৎসবমুখর এই সময়ে দেশের বাজারে রঙিন ফুলের উপস্থিতি নিশ্চিত থাকবে, যা সবার আনন্দে ছড়িয়ে দেবে বসন্তের রঙিন ছোঁয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত