উত্তরার বহুতল ভবনে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ গেল তিনজনের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
উত্তরার বহুতল ভবনে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ গেল তিনজনের

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকার উত্তরায় ভোরের নীরবতা ভেঙে শুক্রবার সকালে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি সাততলা আবাসিক ভবনে আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। আগুনে দগ্ধ হয়ে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও প্রাণহানির এই ঘটনা রাজধানীর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানান, শুক্রবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের একটি সাততলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন লাগার খবর পেয়ে সকাল ৭টা ৫৪ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসকে জানানো হলে মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই অর্থাৎ সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

প্রাথমিকভাবে উত্তরা ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ভবনটি আবাসিক হওয়ায় ভেতরে অনেক মানুষ আটকা পড়ার আশঙ্কা ছিল। আগুনের ধোঁয়া দ্রুত উপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন, আবার কেউ কেউ ধোঁয়ার কারণে বের হতে না পেরে ফ্ল্যাটের ভেতরেই আটকে পড়েন।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম আরও জানান, সকাল ৮টা ২৫ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও পুরোপুরি নির্বাপণ করতে সময় লাগে সকাল ১০টা পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় ফ্ল্যাটের ভেতরের আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও গৃহস্থালির জিনিসপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবনের দ্বিতীয় তলার বেশির ভাগ অংশ এবং ধোঁয়ার কারণে উপরের তলাগুলোও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

এই অগ্নিকাণ্ডে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস নিশ্চিত করেছে। নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে, তারা আগুন লাগার সময় ফ্ল্যাটের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন এবং ধোঁয়া ও তাপের কারণে বের হতে পারেননি। এছাড়া অন্তত ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করে দ্রুত কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার পরপরই ভবনের ভেতর থেকে চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ধোঁয়ার কারণে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায় এবং অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন। কেউ কেউ জানালা ভেঙে বাইরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে ভবনের ভেতর থেকে কয়েকজনকে বের করে আনতে সহায়তা করেন, তবে আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় সবাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ সদস্যরাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করেন। পুলিশ সূত্র জানায়, আগুন লাগার কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি পুলিশও আলাদাভাবে ঘটনা খতিয়ে দেখছে।

এদিকে এই দুর্ঘটনায় শোক নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। সকালবেলা কাজের প্রস্তুতির মধ্যে হঠাৎ এমন মর্মান্তিক ঘটনায় অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রতিবেশীরা জানান, ভবনটিতে বেশ কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিল। নিয়মিত সকালবেলায় শিশুদের স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি ও অফিসগামী মানুষের ব্যস্ততা দেখা যেত। সেই পরিচিত পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় ধোঁয়া, আগুন আর আতঙ্কে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর আবাসিক ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। অনেক ভবনেই অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার এক্সিট বা জরুরি সিঁড়ির ব্যবস্থা কার্যকরভাবে নেই। ফলে আগুন লাগলে দ্রুত বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। উত্তরার এই ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে আবার সামনে এনে দিয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভবনগুলো নির্মাণের সময় অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা মানা হলেও পরে অনেক ক্ষেত্রে তা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। বৈদ্যুতিক লাইন পুরোনো হয়ে গেলে বা অতিরিক্ত লোড পড়লে শর্ট সার্কিটের ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিয়মিত তদারকি ও সচেতনতা ছাড়া এমন দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন।

নিহতদের স্বজনদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভ দুটোই কাজ করছে। তারা দাবি করছেন, যদি ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকত এবং দ্রুত সবাইকে বের করে আনার সুযোগ মিলত, তাহলে হয়তো প্রাণহানি এড়ানো যেত। একই সঙ্গে তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই অগ্নিকাণ্ডের পর রাজধানীর অন্যান্য বহুতল ভবনের বাসিন্দারাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই নিজেদের ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ভবনের ফায়ার এক্সিট, অ্যালার্ম ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

উত্তরার এই মর্মান্তিক ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো, নগর জীবনে সামান্য অবহেলাও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তিনটি প্রাণের অপূরণীয় ক্ষতি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজের জন্যই এক গভীর বেদনার কারণ। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে হলে শুধু উদ্ধার তৎপরতা নয়, বরং আগাম সতর্কতা, কঠোর তদারকি এবং নাগরিক সচেতনতার ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, তদন্ত শেষে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং ভবিষ্যতে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। তবে তার আগেই এই দুর্ঘটনা রাজধানীর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়নের দাবি জোরালো করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত