প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের জন্য ফুটবল মানেই লড়াই, কিন্তু কখনও কখনও সেই লড়াই শারীরিক ও মানসিক সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই চোটের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয় এই ২৭ বছর বয়সী খেলোয়াড়কে। সম্প্রতি আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনের (এএফএ) স্টুডিওতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্তিনেজ জানিয়েছেন, হাঁটুর এসিএল চোটের পুনর্বাসনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তিনি এমনও ভেবেছিলেন যে, হয়তো ফুটবলকে বিদায় জানানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
২০২২ বিশ্বকাপজয়ী এই ডিফেন্ডার মনে করিয়ে দেন, সেই সময় তার মানসিক অবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। মার্তিনেজ বলেন, ‘‘প্রথম দু-তিন সপ্তাহের পরই আমার আর ফুটবল খেলতে ইচ্ছা করছিল না। এর আগে পায়ের চোটে ভুগেছি, এবার হাঁটু। তখন মনে হয়েছিল, অনেক হয়েছে, আর না।’’ ২০২২-২৩ মৌসুমের শেষ দিকে তিনি পায়ের চোটে পড়েছিলেন এবং পরবর্তী মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে মাত্র ১১টি ম্যাচ খেলতে সক্ষম হন। তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে হাঁটুর এসিএল চোট, যা তাঁকে প্রায় ১০ মাস মাঠের বাইরে রাখে।
মার্তিনেজের কথায়, চোটের সময় ব্যথা এতটাই অসহনীয় ছিল যে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। ‘‘শুরুতে আমার প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘আমি বাড়ি ফিরে যাব, পরিবার নিয়ে আর্জেন্টিনা চলে যাব। অনেক হয়েছে। আমি আর কষ্ট সহ্য করতে চাই না। আমি জীবনটা উপভোগ করতে চাই।’ ভারসাম্যহীন অবস্থায় আপনি যেকোনো কিছু বলতে পারেন, কারণ তখন আপনি নিজের মধ্যে থাকেন না। তিন সপ্তাহ ছিল শোকের সময়, আমি তখন নিজের মধ্যে ছিলাম না।’’
মার্তিনেজ পুনর্বাসনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘শারীরিক, মানসিক ও ব্যক্তিগত—সব দিক থেকেই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়। তখন মনে হয়, আমি আর ফুটবলারই নই।’’ এই কঠিন সময়ে তিনি পরিবারের, কাছের মানুষ এবং পেশাদার মনোবিদের সহায়তা পেয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এসেছে তাঁর মেয়ের জন্ম থেকে। ‘‘আমার মেয়ের জন্মই সব বদলে দিয়েছে। চোটে পড়ার এক মাস পর ওর জন্ম। তখনই বলেছি, ‘না, আমি হাল ছাড়ব না।’ প্রতিদিন অনুশীলনে যেতাম শুধু ওর জন্য।’’
গত ৩০ নভেম্বর ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে মাঠে ফেরেন মার্তিনেজ। ধীরে ধীরে তিনি আবার নিয়মিত খেলছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে এবং লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অনুশীলনেও ফিরে গেছেন, যা ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে বড় ইতিবাচক বার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে। নিজের বর্তমান অবস্থার কথা তিনি তুলে ধরেন, ‘‘আমি এখন খুব ভালো অনুভব করছি। ভেবেছিলাম ফেরা আরও কঠিন হবে, কিন্তু ধাপে ধাপে সব করা হয়েছে। ক্লাব দারুণভাবে বিষয়টা সামলেছে। এখন শারীরিক ও মানসিক—দুই দিক থেকেই আমি আগের চেয়ে ভালো।’’
মার্তিনেজ আরও বলেন, ‘‘চোটকে ধন্যবাদ বলা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি। কারণ, কেউই চোট পেতে চায় না। তবে এই চোটের কারণেই আজ আমি বলতে পারি, মানুষ হিসেবে আমি অনেক বদলেছি। জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। জীবনকে এখন আরও বেশি মূল্য দিই; আবহাওয়া, ঘাসের গন্ধ, একটি বল, মাঠে নামার অনুভূতি—সবকিছুই।’’
এই সাক্ষাৎকারে মার্তিনেজ যে বার্তা দিয়েছেন তা স্পষ্ট—চোট, হতাশা এবং কঠিন সময়ের মধ্যেও প্রতিটি দিনকে মূল্যায়ন করা এবং ব্যক্তিগত জীবনকে শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করা যায়। ক্যারিয়ারের চ্যালেঞ্জ ও পুনর্বাসনের গল্প শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড়ের নয়, বরং সবার জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্তিনেজের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মানুষকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে এবং প্রিয়জনদের উপস্থিতি জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আসন্ন মৌসুমে মার্তিনেজের ফর্ম এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে তার অবদান অবশ্যই ভক্তদের জন্য দারুণ প্রত্যাশার জন্ম দিচ্ছে। কঠিন সময়ের পর ফিরে আসা এই ডিফেন্ডারের দৃঢ়তা এবং প্রতিজ্ঞা ফুটবল প্রেমীদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। চোটে ভেঙে পড়া থেকে মাঠে ফিরার এই গল্প প্রমাণ করে, ধৈর্য, পরিবার ও অনুপ্রেরণা মানুষের জীবনের অমূল্য শক্তি হতে পারে।