ইরানে এখনই হামলা নয়, ট্রাম্পকে অনুরোধ নেতানিয়াহুর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭১ বার
ইরানে হামলা না চালাতে অনুরোধ

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেই ইরানে এই মুহূর্তে সামরিক হামলা না চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি ফোনালাপে তিনি এই অনুরোধ জানান বলে জানিয়েছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা আপাতত বিলম্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় রেখে এই অনুরোধ এসেছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং এর প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার এক বক্তব্যে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনাও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানান ট্রাম্প। তবে তিনি কার কাছ থেকে এই তথ্য পেয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। শুধু বলেন, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র’ থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই ইরান সরকার বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা কমিয়ে আনে, তাহলে তা সামরিক উত্তেজনা প্রশমিত করার একটি কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। এই বাস্তবতায় নেতানিয়াহুর অনুরোধকে অনেকেই একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যেখানে সামরিক হামলার বদলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষেই ঝুঁকছে ইসরাইল।

এদিকে ইসরাইলের প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল-১২ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির সামরিক সদর দপ্তরে দীর্ঘ আলোচনার পর ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তারা যেকোনো মার্কিন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানে সরাসরি হামলা চায় না। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি নিরাপত্তা মহল মনে করছে, এখনই হামলা চালানো হলে তার রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য অত্যন্ত বেশি হতে পারে।

চ্যানেল-১২-এর প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে এই বিষয়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত ছয় দিনের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এই ঘন ঘন যোগাযোগ থেকেই বোঝা যায়, ইরান ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা কতটা নিবিড় পর্যায়ে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কৌশল সব সময় পুরোপুরি একরকম না হলেও, মূল লক্ষ্য নিয়ে তাদের অবস্থান প্রায় একই। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং পশ্চিমা স্বার্থের প্রতি হুমকি—এই তিনটি বিষয়ই দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। তবে কখন ও কীভাবে চাপ প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্য দেখা যায়।

বর্তমানে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব একসঙ্গে কাজ করছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামরিক হামলার বদলে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে। নেতানিয়াহুর অনুরোধ সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন তারা।

অন্যদিকে, ইরান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আগ্রাসী অবস্থান নিয়ে আসছে। দেশটির নেতৃত্ব দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক চাপ ইরানের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই অবস্থায় যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে, যা পুরো অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও ইরান নীতি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। একপক্ষ সামরিক চাপ ও কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকলেও, আরেক পক্ষ মনে করছে, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের মাধ্যমেই ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য—যেখানে তিনি বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হওয়ার কথা বলেছেন—এই দ্বিতীয় অবস্থানের দিকেই ইঙ্গিত দেয় বলে অনেকের মত।

ইসরাইলের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি কেবল সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক। ইরানে হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়ায় লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজা উপত্যকার সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত বাহিনীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে একাধিক ফ্রন্টে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বাস্তবতায় নেতানিয়াহুর অনুরোধকে অনেকেই সময় কেনার কৌশল হিসেবে দেখছেন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা, অন্যদিকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ—এই দুই লক্ষ্য পূরণ করতেই আপাতত হামলা থেকে সরে আসার বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নেতানিয়াহুর অনুরোধ এবং ট্রাম্পের বক্তব্য—দুটোই ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্তত এই মুহূর্তে ইরানকে ঘিরে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়াতে চাইছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। তবে পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল থাকবে এবং ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে ইরানের অভ্যন্তরীণ গতিপথ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত