প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের জন্য একটি অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা ‘শান্তি পর্ষদ’। হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে এই পর্ষদের সদস্যদের নাম প্রকাশ করার পর বিশ্ব রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও থেকে শুরু করে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি এই পর্ষদকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত করে তুলেছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গাজা উপত্যকার অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কার্যক্রম তদারকি করাই হবে এই শান্তি পর্ষদের মূল লক্ষ্য। যুদ্ধবিরতির পরবর্তী সময়ে গাজার শাসনব্যবস্থা যাতে কার্যকর ও স্থিতিশীল থাকে, সেই দায়িত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভাগাভাগি করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ডকে ঘিরে যেমন কূটনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে সন্দেহ ও উদ্বেগও।
শান্তি পর্ষদের ঘোষিত সদস্যদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাবশালী এই রাজনীতিকের উপস্থিতি বোর্ডটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। তাঁর সঙ্গে থাকছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকভ, যিনি সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন মধ্যস্থতামূলক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও চমক তৈরি করেছে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের অন্তর্ভুক্তি। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা এবং ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী ভূমিকা অনেকের কাছেই বিতর্কিত হলেও পশ্চিমা কূটনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এই পর্ষদে জায়গা পেয়েছেন ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনার অন্যতম রূপকার হিসেবে পরিচিত কুশনার এর আগেও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর উপস্থিতি শান্তি পর্ষদকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে, এই শান্তি পর্ষদে সদস্য হিসেবে থাকছেন মার্কিন ধনকুবের মার্ক রোয়ান, যিনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও পুনর্গঠনমূলক কার্যক্রমে অভিজ্ঞ। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য ভূমিকার কারণে তাঁর অন্তর্ভুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েলও এই পর্ষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
পর্ষদের কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের জন্য জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক বিশেষ দূত নিকোলাই ম্লাদেনভকে গাজায় উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে হোয়াইট হাউস এখনো পর্ষদের সদস্যদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব বা ক্ষমতার সীমা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেনি। এই অস্পষ্টতা নিয়েই নানা প্রশ্ন উঠছে।
শান্তি পর্ষদ গঠনের ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ কার্যকর থাকলেও মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ ও হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে ফিলিস্তিনিদের একটি বড় অংশ এই পর্ষদের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তাঁদের মতে, বাস্তবিক নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের সমাধান ছাড়া কাগুজে বোর্ড বা আন্তর্জাতিক পর্ষদ গাজাবাসীর দুর্দশা লাঘব করতে পারবে না।
এই শান্তি পর্ষদ গঠন করা হয়েছে গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে। ট্রাম্প নিজে তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে গত বৃহস্পতিবার এই পর্ষদ গঠনের ঘোষণা দেন। সেই পোস্টে তিনি হামাসের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ট্রাম্প বলেন, হামাসকে অবশ্যই তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের কাছে সর্বশেষ জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর এবং কোনো ধরনের কালক্ষেপণ ছাড়াই পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণের পথে অগ্রসর হওয়া।
গাজা ইস্যুতে ট্রাম্পের এই উদ্যোগ হঠাৎ নেওয়া নয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতির একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরা হয়। এতে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, উপত্যকায় একটি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় গত ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ কার্যকর হয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, শান্তি পর্ষদের কাঠামো ও সদস্যদের প্রভাব বিবেচনায় এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক উদ্যোগ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। গাজার বাস্তবতা হলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহর, মানবিক বিপর্যয় এবং লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। এসব সমস্যা সমাধানে কেবল রাজনৈতিক তদারকি নয়, প্রয়োজন কার্যকর মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন পরিকল্পনা ও স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন।
ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে এই উদ্যোগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ আশা করছেন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত এই পর্ষদ হয়তো গাজায় স্থায়ী শান্তির পথ সুগম করবে। আবার অনেকের আশঙ্কা, এটি পশ্চিমা স্বার্থনির্ভর একটি কাঠামো হয়ে উঠতে পারে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব মতামত ও অধিকার উপেক্ষিত থাকবে।
সব মিলিয়ে গাজায় ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই উদ্যোগ আদৌ গাজাবাসীর জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা বয়ে আনবে, নাকি এটি আরেকটি বিতর্কিত কূটনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হবে—তা নির্ভর করবে সময়, বাস্তব প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তরিকতার ওপর। যুদ্ধবিরতির নাজুক বাস্তবতায় গাজাবাসী এখনো তাকিয়ে আছে টেকসই শান্তির আশায়, যেখানে কেবল ঘোষণা নয়, বাস্তব পরিবর্তনই হবে শেষ কথা।।