প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ সৌদি আরব আরও একবার বিশ্ব খনিজ শিল্পে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করল। দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খনন কোম্পানি মা’আদেন (Ma’aden) নতুন করে চারটি খনি এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা উত্তোলনের ঘোষণা দিয়েছে। কোম্পানিটির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এসব খনি থেকে মোট ৭৮ লাখ আউন্স সোনা উত্তোলন করা হয়েছে, যা প্রতি কেজিতে গড়ে ৩৫ আউন্স হিসাব করলে প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার কেজির সমান। এই সাফল্য সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ খনিজ সম্পদের ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি দেশটিকে বৈশ্বিক সোনা উত্তোলন শিল্পে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মা’আদেন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লক্ষ্যভিত্তিক ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খনন কার্যক্রমের মাধ্যমেই এই বিপুল সোনা উত্তোলন সম্ভব হয়েছে। শুরুতে কোম্পানির লক্ষ্য ছিল ৯০ লাখ আউন্সের বেশি সোনা উত্তোলন করা। তবে বার্ষিক হিসাব-নিকাশ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমিয়ে আনা হয়। তারপরও চূড়ান্ত ফলাফল প্রত্যাশার কাছাকাছিই রয়েছে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এই সোনা উত্তোলন করা হয়েছে সৌদি আরবের চারটি গুরুত্বপূর্ণ খনি এলাকা থেকে। এগুলো হলো মানসুরাহ মাসসারাহ, উরুক ২০/২১, উম্ম আস সালাম এবং ওয়াদি আল জাও। এর মধ্যে মানসুরাহ মাসসারাহ খনি থেকেই সবচেয়ে বেশি সোনা পাওয়া গেছে। শুধু এই খনি থেকেই উত্তোলন হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ আউন্স সোনা, যা সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উরুক ২০/২১ ও উম্ম আস সালাম খনি মিলিয়ে উত্তোলিত হয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ৭০ হাজার আউন্স সোনা। অন্যদিকে, নতুন খনি হিসেবে যুক্ত হওয়া ওয়াদি আল জাও থেকে প্রথমবারের মতো উত্তোলন করা হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ ৮০ হাজার আউন্স সোনা। নতুন এই খনির সাফল্য সৌদি আরবের খনিজ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
মা’আদেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বব উইল্ট এই অর্জনকে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে মা’আদেনের পরিকল্পনা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মাঠপর্যায়ে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, সৌদি আরবের সোনার ভান্ডারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পেছনে এ ধরনের সাফল্যই সবচেয়ে বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
বব উইল্ট আরও বলেন, চারটি এলাকায় খননকাজের মাধ্যমে ৭০ লাখ আউন্সের বেশি সোনা উত্তোলনের ঘটনা মা’আদেনের সম্ভাবনা ও সক্ষমতাকেই তুলে ধরে। তিনি জানান, অনুসন্ধান ও খনি উন্নয়ন কার্যক্রম যত এগোচ্ছে, ততই কোম্পানির সম্পদভিত্তি শক্তিশালী হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নগদ অর্থ প্রবাহ বাড়বে, যা নতুন প্রকল্প ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল সোনা উত্তোলন শুধু মা’আদেন বা সৌদি আরবের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক সোনা বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম, চাহিদা ও সরবরাহের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যখন বিশ্ব অর্থনীতি নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের মতো একটি দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির খবর বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে তেলনির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনার দিকে জোর দিয়েছে। ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার আওতায় খনিজ সম্পদ উন্নয়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মা’আদেনের এই সাফল্য সেই পরিকল্পনারই অংশ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। খনিজ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং তেলনির্ভরতা কমানোর পথে এগোচ্ছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন খনি ওয়াদি আল জাও থেকে প্রথমবারের মতো সোনা উত্তোলনের সাফল্য ভবিষ্যতে আরও নতুন খনি অনুসন্ধানের পথ প্রশস্ত করবে। সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ মরুভূমি অঞ্চলে এখনও অনেক সম্ভাবনাময় খনিজ এলাকা রয়েছে, যেগুলো আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অনুসন্ধান করা হলে আরও বড় ভান্ডারের সন্ধান মিলতে পারে।
মা’আদেন ইতোমধ্যেই নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ ও বিশ্বমানের খনন কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সোনা ছাড়াও কোম্পানিটি ফসফেট, অ্যালুমিনিয়াম ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ উত্তোলনে সক্রিয়। তবে সাম্প্রতিক এই সোনা উত্তোলনের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিনিয়োগ মহলে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২ লাখ ২১ হাজার কেজি সোনা উত্তোলনের এই ঘোষণা সৌদি আরবের খনিজ শিল্পে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন দেশটির অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক সোনা বাজারে সৌদি আরবের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে। ভবিষ্যতে অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে সৌদি আরব যে বিশ্ব সোনা উৎপাদনের মানচিত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তা বলাই যায়।