প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জিম্বাবুয়ের বুলাওয়েতে চলমান অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ম্যাচটি মাঠের খেলায় যতটা না আলোচিত হয়েছে, তার চেয়েও বেশি আলোচনা তৈরি করেছে টসের মুহূর্তের একটি দৃশ্য। শনিবার ১৭ জানুয়ারি কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠে টসের সময় বাংলাদেশের অধিনায়ক জাওয়াদ আবরার ও ভারতের অধিনায়ক আয়ুশ মাহাত্রের মধ্যে দেখা যায় ‘নো হ্যান্ডশেক’ ঘটনা। দুই অধিনায়ক একে অপরের দিকে না তাকিয়েই টস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন, যা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ব্যাখ্যার জন্ম দেয়।
ক্রিকেট বিশ্বে টসের সময় বা ম্যাচ শেষে হাত মেলানো দীর্ঘদিনের একটি সৌজন্য রীতি হিসেবে পরিচিত। এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ক্রীড়াসুলভ আচরণের প্রতীক। যদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী হ্যান্ডশেক বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এমন দৃশ্য অনুপস্থিত থাকলে তা স্বাভাবিকভাবেই নজর কাড়ে। বাংলাদেশ–ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ ম্যাচের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে।
টসে জিতে বাংলাদেশ দল ভারতকে ব্যাটিংয়ে পাঠায়। কিন্তু টসের আগে বা পরে দুই অধিনায়কের মধ্যে কোনও ধরনের সৌজন্যমূলক হাত মেলানোর দৃশ্য দেখা যায়নি। মাঠে উপস্থিত দর্শক এবং সম্প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় দ্রুতই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি ইচ্ছাকৃত ছিল, নাকি নিছকই একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত।
এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রীড়াঙ্গন এবং সামগ্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা চলমান। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের ক্রীড়া সম্পর্ক ঘিরে কিছু সংবেদনশীল ইস্যু সামনে এসেছে, যার প্রভাব ক্রিকেটেও পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের খেলোয়াড়রা যদিও ভবিষ্যতের তারকা হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার পথে রয়েছে, তবুও বড় পরিসরের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বাস্তবতা যে কখনও কখনও তরুণদের ম্যাচেও ছায়া ফেলে, সেটি এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছে।
চলতি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ও ভারত একই গ্রুপে রয়েছে। গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচটি উভয় দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ম্যাচের আগে ‘নো হ্যান্ডশেক’ ঘটনার কারণে খেলাধুলার বাইরের বিষয়গুলো আলোচনায় চলে আসে। অনেক ক্রিকেটপ্রেমী মনে করছেন, মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই তীব্র হোক, সৌজন্য ও ক্রীড়াসুলভ আচরণ বজায় রাখা উচিত ছিল। আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি দুই অধিনায়কের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে, বরং পরিস্থিতিগত বা আনুষ্ঠানিক কোনও কারণও থাকতে পারে।
এই ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন নজির দেখা গেছে। গত সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার ম্যাচে টসের সময় এবং ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড়রা হাত মেলাননি। সে সময় ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব সংবাদ সম্মেলনে ভারত–পাকিস্তানের সামরিক উত্তেজনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলেন। ওই টুর্নামেন্টে ভারত ও পাকিস্তানের তিনটি ম্যাচেই হ্যান্ডশেক না হওয়ার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশ–ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ ম্যাচের ক্ষেত্রে অবশ্য কোনও পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য আসেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি হয়তো সম্প্রচারজনিত বা প্রটোকলগত কোনও বিভ্রান্তি হতে পারে। আবার কেউ বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের টানাপোড়েনের প্রতিফলন হিসেবেই এই দৃশ্য দেখা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আরও একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। ভারতে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিও দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে বিসিবি ভারতের ভেন্যুতে বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। উগ্রপন্থীদের হুমকি, আইপিএলে মুস্তাফিজুর রহমানের অংশগ্রহণ বাতিল এবং আইসিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক দলের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের এই ম্যাচে অধিনায়কদের হাত না মেলানোর ঘটনা তাই অনেকের চোখে বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ। যদিও ক্রিকেট বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তরুণ খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে এসব বিতর্কের বাইরে রাখা জরুরি। কারণ এই বয়সে খেলোয়াড়দের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটে অভ্যস্ত হওয়া।
ক্রিকেট ইতিহাসে সৌজন্যের বিষয়টি বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছে। মাঠের লড়াই শেষে প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানো খেলাটির সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে। সে কারণেই হ্যান্ডশেক না হওয়া নিয়ে আলোচনা হয়, সমালোচনা হয়, আবার কখনও কখনও তা ব্যাখ্যারও দাবি রাখে। বাংলাদেশ–ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ ম্যাচের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কী কারণে এই ‘নো হ্যান্ডশেক’ ঘটেছে, তা পরিষ্কার না হলেও বিষয়টি যে ক্রিকেটপ্রেমীদের দৃষ্টি কেড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ভবিষ্যতে দুই দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা এলে বিতর্ক অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে। তবে আপাতত এই ঘটনাটি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের একটি আলোচিত মুহূর্ত হয়ে থাকল। খেলাধুলার মাঠে সৌজন্য, সম্মান ও ক্রীড়াসুলভ আচরণ যে এখনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সেই আলোচনাই আবারও সামনে চলে এসেছে এই এক মুহূর্তের দৃশ্যকে ঘিরে।