প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অনীহা, অসহযোগিতা বা শৈথিল্য বরদাশত করা হবে না—এমন কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে সরকার। নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, ভুল তথ্য প্রদান বা দায়িত্ব এড়িয়ে চলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দেশের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাছে পাঠানো এক পরিপত্রে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১-এর বিধান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করতে এবং তা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ তাদের আওতাধীন সব অধিদপ্তর, দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নিষ্ঠা বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর দ্রুত মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মো. খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, ৯ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. রাজিবুল আলম স্বাক্ষরিত নির্দেশনাপত্র পাওয়ার পর তা দেশের সব অঞ্চল, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সবাইকে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ অনুসরণ করে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৪৯৯ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নির্বাচনী কাজে যুক্ত থাকবেন। আইন অনুযায়ী, নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত এসব ব্যক্তি সবাই ‘নির্বাচন কর্মকর্তা’ হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাঁরা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
পরিপত্রে আরও বলা হয়, নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১-এর ৪ ধারায় নির্বাচন কর্মকর্তার চাকরি সংক্রান্ত বিষয় এবং ৫ ধারায় শৃঙ্খলামূলক বিধানাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এই আইনের আওতায় নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো দায়িত্ব পালনে অনীহা, অসহযোগিতা, শৈথিল্য বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য প্রদান করলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে। এমন অভিযোগে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে সরকারের পক্ষ থেকে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।
আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে পরিপত্রে সতর্ক করা হয়েছে যে, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র না থাকলেও কেউ যদি নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত থাকেন এবং কমিশনের কোনো নির্দেশ পালন বা তথ্য সরবরাহের দায়িত্বে থাকেন, তাহলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচিত হবেন। অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কেউই আইনের বাইরে থাকার সুযোগ পাবেন না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকরা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, নায়েম, ব্যানবেইস, এনটিআরসিএ, এনসিটিবি ও ইইডিসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও সংস্থাকে এ বিষয়ে বিশেষভাবে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে।
সরকারের এই কঠোর অবস্থানকে অনেকেই আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন ব্যবস্থায় নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। ভোটের মাঠে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এবার শুরুতেই কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও সম্পাদনের লক্ষ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সততা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের শৈথিল্য বা গাফিলতি না দেখাতে এবং কমিশনের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯১ কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে নির্বাচনী ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বাড়বে। এতে একদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের ভূমিকা পালনে আরও সতর্ক হবেন, অন্যদিকে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও আস্থা সৃষ্টি হতে পারে। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে উল্টো বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সরকারের এই নির্দেশনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অনীহা দেখানোর সুযোগ নেই। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে আইন মেনে দায়িত্ব পালন করতে হবে, অন্যথায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। নির্বাচনকে ঘিরে এই কড়া বার্তা কতটা কার্যকর হয়, তা এখন নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ে বাস্তব প্রয়োগ ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকার ওপর।