অর্থ ছাড়ে আপত্তি, থমকে শ্যামপুর–সেতাবগঞ্জ চিনিকল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
অর্থ ছাড়ে আপত্তি, থমকে শ্যামপুর–সেতাবগঞ্জ চিনিকল

প্রকাশ:  ১৮  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুরের শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ—উত্তরাঞ্চলের এই দুই ঐতিহ্যবাহী চিনিকল ঘিরে আবারও অনিশ্চয়তা ঘনিয়ে উঠেছে। বন্ধ চিনিকল চালুকরণ টাস্কফোর্স কমিটির সুপারিশ, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) উদ্যোগ এবং আখচাষিদের প্রত্যাশা—সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে থেমে গেছে এই দুই চিনিকল চালুর প্রক্রিয়া। ফলে কবে নাগাদ আবার আখমাড়াই শুরু হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন করে হতাশায় ডুবে গেছেন আখচাষি, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও চিনিকলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালু ও লাভজনকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাড়াই স্থগিত থাকা চিনিকলগুলোর ওপর থেকে স্থগিতাদেশ তুলে নেয় বিএসএফআইসি। এতে করে উত্তরাঞ্চলের শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল চালু হওয়ার সম্ভাবনায় নতুন করে আশার আলো দেখেছিলেন স্থানীয় মানুষজন।

বিএসএফআইসির তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালে ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ছয়টির আখমাড়াই স্থগিত করে তৎকালীন সরকার। এর মধ্যে ছিল রংপুরের শ্যামপুর, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় ও রংপুর চিনিকল। মূলত লোকসানের অজুহাত দেখিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সরকারের পরিবর্তনের পর বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের কথা উঠলেও বাস্তবে সেই পুরোনো ‘লোকসান’ যুক্তিই আবার সামনে এনে অর্থ বরাদ্দে আপত্তি জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম ধাপে শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকলে ২০২৭–২৮ মৌসুম থেকে আখমাড়াই শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়। এজন্য তিন বছরে পর্যায়ক্রমে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল, যার সূচনা হওয়ার কথা ছিল ২০২৪–২৫ অর্থবছর থেকে। কিন্তু সেই অর্থ ছাড়ের পথেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি।

বিএসএফআইসির নথিপত্র বলছে, ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শ্যামপুর চিনিকলের জন্য ৫১ কোটি ৭০ লাখ এবং সেতাবগঞ্জ চিনিকলের জন্য ৬৬ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে গত বছরের ১৩ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়। তবে এর জবাবে ৩০ জুলাই অর্থ বিভাগ জানিয়ে দেয়, বিগত দুই দশকে বিএসএফআইসিকে ‘পরিচালন ঋণ’ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে লোকসানি হওয়ায় সরকারি ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগেই চিনিকলগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। এই যুক্তিতেই নতুন করে অর্থ বরাদ্দ দিতে অসম্মতি জানানো হয়।

টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, একটি চিনিকল লাভজনক করতে কমপক্ষে তিনটি মৌসুম সময় লাগে। অন্তর্বর্তী সরকার দেরি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দুটি মৌসুম নষ্ট হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের মতোই বর্তমানেও লোকসানের অজুহাত দেখানো হচ্ছে এবং কৃষকের স্বার্থ ও দেশীয় শিল্প রক্ষার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয় টাস্কফোর্সের সদস্যদের কোনো মতামতও নেয়নি বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শ্যামপুর চিনিকল চালু হওয়ার খবরে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী ছিলেন রংপুর অঞ্চলের আখচাষি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর রেলস্টেশন বাজারে কথা হয় আখচাষি মঞ্জিল হোসেন, আজহার আলী ও কার্তিক চন্দ্র শীলের সঙ্গে। তাঁরা জানান, একসময় এই অঞ্চলে প্রায় ছয় হাজার একর জমিতে আখ চাষ হতো। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তা কমে মাত্র ৬০০ একরে নেমে এসেছে। মিল চালুর আশায় তাঁরা আবার আখ রোপণ শুরু করেছিলেন, কিন্তু এখন আবার অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

বদরগঞ্জ উপজেলার কিশামত গোপালপুর গ্রামের কৃষক আবুল ওয়াহাব মিয়া বলেন, আখ ছিল এই এলাকার মানুষের জীবনের প্রধান ভরসা। আখ বিক্রি করে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা পাওয়া যেত, যা দিয়ে সংসার চালানো, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা এবং বাড়িঘর তৈরি সম্ভব হতো। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু আখচাষিই নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট, বাজার, ছোট ব্যবসা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন।

টাস্কফোর্সের আরেক সদস্য ও রংপুর জেলা কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন মনে করেন, চিনিকল কেবল একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্র। এর সঙ্গে আখচাষি, কৃষিশ্রমিক, কারখানার শ্রমিক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। চিনিকল চালু থাকলে একদিকে বেকারত্ব কমে, অন্যদিকে দেশের চিনির ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তাই তিনি দ্রুত সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল চালুর দাবি জানান।

শ্যামপুর চিনিকলে সরেজমিনে গেলে দেখা যায় হতাশাজনক চিত্র। ১৯৬৪ সালে ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই মিল এখন কার্যত পরিত্যক্ত। চারপাশে সুনসান নীরবতা, ভেতরে আগাছায় ভরে গেছে পুরো এলাকা। মিল চালু থাকাকালে এখানে ৪৯৩ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করতেন। বর্তমানে অবসর ও বদলির পর সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬৪ জন।

শ্যামপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির পর বাজেট কমিয়ে ন্যূনতম অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হলেও সেটিও এখনো পাওয়া যায়নি। একই অবস্থা সেতাবগঞ্জ চিনিকলের। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, বিএসএফআইসি শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অর্থ ছাড়ের বিষয়ে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।

সব মিলিয়ে শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল চালুর উদ্যোগ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সরকারের একদিকে বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের আশ্বাস, অন্যদিকে অর্থ ছাড়ে অনাগ্রহ—এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ। উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও আখভিত্তিক কৃষির ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আপাতত অজানাই থেকে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত