প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গত সপ্তাহজুড়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ঘনীভূত হয়েছিল যুদ্ধের আশঙ্কা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জোর গুঞ্জন ওঠে—তেহরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, ট্রাম্পের প্রকাশ্য ইঙ্গিত এবং আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা সেই শঙ্কাকে আরও উসকে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত সেই হামলা আর হয়নি। বরং পর্দার আড়ালে ঘটে যায় এক নাটকীয় কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ, যার কেন্দ্রে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা ঠেকাতে সরাসরি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ট্রাম্পকে দেওয়া তার অনুরোধ ছিল স্পষ্ট—এই মুহূর্তে ইরানে আঘাত হানা হলে তার ফলাফল সামাল দেওয়ার জন্য ইসরাইল প্রস্তুত নয়। নেতানিয়াহুর এই বার্তা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ, তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে জানান যে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা মোকাবিলায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো পূর্ণ প্রস্তুতিতে নেই। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর ইসরাইলের নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। এই বাস্তবতায় হঠাৎ করে ইরানে হামলা হলে, তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেহরান ইসরাইলকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে—যার জবাব দেওয়া এই মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, শুধু ইসরাইলের অনুরোধই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাও হামলা থেকে সরে আসার পেছনে বড় কারণ ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে তখন যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মোতায়েন ছিল না, যা ইরানের পাল্টা আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে আঞ্চলিক ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি তখন অসম্পূর্ণ ছিল।
গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ১২ দিনের উত্তপ্ত সংঘাত এখনও নীতিনির্ধারকদের মনে তাজা। সেই সময় ইরান ইসরাইলের দিকে যেসব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, তার একটি বড় অংশ প্রতিহত করতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ওয়াশিংটনের সেই সহায়তা ছাড়া ইসরাইলের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারত বলে ধারণা করা হয়। ফলে নতুন করে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইসরাইল কার্যত ঝুঁকির মুখে পড়বে—এই বাস্তবতা নেতানিয়াহুকে আরও সতর্ক করে তোলে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত বুধবার ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে ইরানে হামলা প্রায় অবশ্যম্ভাবী। সামরিক পরিকল্পনা, কূটনৈতিক প্রস্তুতি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ তখন তুঙ্গে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। সেই মোড় ঘোরানোর পেছনে শুধু ইসরাইলের বার্তাই নয়, আরও একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যমতে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকোফের কাছে একটি খুদেবার্তা পাঠান। বার্তার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা না হলেও, সেটি উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত বহন করেছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এই বার্তা হোয়াইট হাউসের ভেতরে আলোচনার নতুন জানালা খুলে দেয় এবং সামরিক পথের বদলে কূটনৈতিক বিকল্প ভাবতে উৎসাহ জোগায়।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলা কেন এড়ানো হলো—তা নিয়ে ট্রাম্প নিজেও প্রকাশ্যে কথা বলেন। শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি। ইসরাইল বা অন্য কোনো পক্ষ তাকে হামলা থেকে বিরত থাকতে রাজি করিয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, সিদ্ধান্তটি একান্তই তার নিজের। “কেউ আমাকে রাজি করায়নি। আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি,” বলেন তিনি।
ট্রাম্প আরও জানান, ইরানের অভ্যন্তরীণ একটি মানবিক ইস্যুও তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। তার ভাষায়, “গতকাল আটশর বেশি ফাঁসির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কাউকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি—ফাঁসিগুলো বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি আমার সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে।” এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ছিল ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য দেখানোর চেষ্টা; আবার কেউ কেউ একে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির জটিলতা আরও একবার স্পষ্ট করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, তেমনি ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগও গভীর ও বহুস্তরবিশিষ্ট। ইরানে হামলা হলে সেটি কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না; বরং এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ত গোটা অঞ্চলে। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলোও এর প্রভাব থেকে রেহাই পেত না।
ইসরাইলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ইরানকে বড় শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সময় ও প্রস্তুতির প্রশ্নটি সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহুর অনুরোধে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, কৌশলগতভাবে সঠিক সময় ছাড়া সংঘাতে জড়ানো মানে নিজ দেশের নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলা।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও এই সিদ্ধান্ত ছিল ভারসাম্যের পরীক্ষা। একদিকে শক্ত অবস্থান দেখানোর রাজনৈতিক চাপ, অন্যদিকে যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সংযমের পথই বেছে নেওয়া হয়েছে। আপাতত মধ্যপ্রাচ্য বড় ধরনের সংঘাত থেকে রক্ষা পেলেও, উত্তেজনার আগুন যে পুরোপুরি নিভে গেছে, তা বলা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, ইরানে সম্ভাব্য হামলা ঠেকানোর পেছনে ইসরাইলের অনুরোধ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাস্তবতা এবং কূটনৈতিক বার্তার সমন্বয় একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো প্রকাশ্য শক্তির চেয়েও নীরব কূটনীতিই বড় সিদ্ধান্তের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।