করাচির শপিং মলে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ছয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
করাচির শপিং মলে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ছয়

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী করাচিতে একটি ব্যস্ত শপিং মলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ২০ জন। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এই আগুন শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় এবং উদ্ধারকর্মীদের জন্য সৃষ্টি করে এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সময় শনিবার রাতে করাচির এমএ জিন্নাহ রোডে অবস্থিত গুল প্লাজা শপিং মলে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস।

রোববার সকালে করাচি ফায়ার ব্রিগেডের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ১৩ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আগুনের তীব্রতায় শপিং মলের কয়েকটি অংশ ধসে পড়েছে, যা উদ্ধারকাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে দমকল বাহিনী, পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনী সিন্ধ রেঞ্জার্স একযোগে কাজ করছে।

স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ছয়জনের মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, যাদের শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেছে এবং ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টের কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গুল প্লাজা শপিং মলটি করাচির অন্যতম বড় ও পুরোনো বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে এক হাজারেরও বেশি দোকান রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ক্রেতা ও ব্যবসায়ী আসেন। কাপড়, ক্রোকারিজ, সুগন্ধি, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, খেলনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিপুল মজুত থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ রূপ নেয়। অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দোকানগুলোর ভেতরে থাকা দাহ্য সামগ্রীর কারণেই আগুনের তীব্রতা দ্রুত বেড়ে যায়।

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, একটি দোকানে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। গার্ডেন এলাকার উপবিভাগীয় পুলিশ কর্মকর্তা মহসিন রাজা সাংবাদিকদের জানান, প্রথমে একটি ছোট দোকানে আগুন লাগে, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তা পাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো মার্কেটকে গ্রাস করে। পুরোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ ও পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব এই দুর্ঘটনাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ঘটনার পরপরই আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য সিন্ধ রেঞ্জার্স মোতায়েন করা হয়। এক বিবৃতিতে রেঞ্জার্স জানায়, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করবে। ভবনের ভেতরে কেউ আটকে আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

আগুন লাগার সময় শপিং মলে থাকা অনেক মানুষ আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ধোঁয়ার ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভেতরে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। অনেকেই জানালা ও সিঁড়ির দিকে ছুটে যান, তবে কিছু জায়গায় বের হওয়ার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আগুন নেভাতে ও আহতদের উদ্ধার করতে স্বেচ্ছায় সাহায্যে এগিয়ে আসেন।

এই অগ্নিকাণ্ড করাচির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অতীতেও করাচিতে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অগ্নিনিরাপত্তা মানদণ্ড মানা না হওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় শপিং মল ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া, আধুনিক অ্যালার্ম সিস্টেম এবং জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করা জরুরি। গুল প্লাজার মতো পুরোনো ভবনগুলোতে এসব ব্যবস্থার ঘাটতি থাকায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পাকিস্তানের বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠন এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণে করাচির এই ব্যস্ত এলাকায় যান চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় হলে ভবনটি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। করাচির মতো মহানগরে প্রতিদিন হাজারো মানুষ শপিং মল ও বাণিজ্যিক ভবনে যাতায়াত করেন। একটি ছোট অবহেলা মুহূর্তেই রূপ নিতে পারে বড় ট্র্যাজেডিতে। নিহতদের স্মরণে শহরের বিভিন্ন স্থানে শোক প্রকাশ করা হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে শোকবার্তা।

সবশেষ খবর অনুযায়ী, আগুন নেভাতে এখনও ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এলাকাটি নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রাখা হবে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে। তবে এই অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত হয়তো দীর্ঘদিন করাচির মানুষের মনে থেকে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত