চিলির দক্ষিণে ভয়াবহ দাবানল, মৃত্যু ও ধ্বংসে জরুরি অবস্থা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৩ বার
চিলির ভয়াবহ দাবানল ও জরুরি অবস্থা

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ চিলিতে ভয়াবহ দাবানল দেশটিকে আবারও এক গভীর মানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রবল বাতাস, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার কারণে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়া এই আগুনে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ঘরছাড়া হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, যানবাহন, বনভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার নুবলে ও বিয়োবিও অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রাজধানী সান্তিয়াগো থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত নুবলে ও বিয়োবিও অঞ্চল গত দুই দিন ধরে দাবানলের তাণ্ডবে কার্যত বিপর্যস্ত। দাবানল একাধিক জনপদে একযোগে ছড়িয়ে পড়ায় দমকল বাহিনী ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো চরম চাপের মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, একসময় প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা জনপদ এখন পরিণত হয়েছে পোড়া ধ্বংসস্তূপে। কালো ছাই, ভেঙে পড়া দেয়াল আর পোড়া গাড়ির সারি যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে আগুনের নির্মমতার।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বিয়োবিও অঞ্চলের পেনকো শহরে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দাবানল দ্রুত শহরের আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়ায় অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেননি। পেনকোর ২৫ বছর বয়সি ছাত্র মাতিয়াস সিদ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, গভীর রাতে পরিস্থিতি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আগুন ঘূর্ণিঝড়ের মতো আচরণ করতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যেই নিচের দিকের শহরের বাড়িগুলো গ্রাস করে। তিনি জানান, শুধু গায়ে থাকা কাপড় নিয়েই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, আর মাত্র ২০ মিনিট দেরি হলে হয়তো কেউই বেঁচে থাকতেন না। এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দাবানলের আকস্মিকতা ও ভয়াবহতা।

পেনকোর পাশের ছোট বন্দর শহর লিরকেনেও পরিস্থিতি ছিল প্রায় একই রকম। প্রায় ২০ হাজার মানুষের এই শহরে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, আগুন এত দ্রুত ছড়িয়েছে যে অনেকেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ৫৭ বছর বয়সি আলেহান্দ্রো আরেদোন্দো বলেন, অনেকে সমুদ্রের দিকে দৌড়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর হতাশা—কিছুই আর আগের মতো নেই, দাঁড়িয়ে থাকার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই।

রোববার রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লিরকেনসহ কয়েকটি এলাকায় সেনাবাহিনীকে রাস্তায় টহল দিতে দেখা যায়। নিরাপত্তা ও উদ্ধারকাজ নির্বিঘ্ন রাখতে রাতের কারফিউ জারি করা হলেও অনেক বাসিন্দাকে টর্চলাইট হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাতে এবং ছোট ছোট আগুন নেভাতে দেখা গেছে। এই দৃশ্য একদিকে মানুষের অসহায়ত্ব, অন্যদিকে দুর্যোগের মুখে পারস্পরিক সহযোগিতার মানবিক চিত্র তুলে ধরে।

চিলির প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল বোরিচ দাবানলের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে নুবলে ও বিয়োবিও অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার ফলে সশস্ত্র বাহিনীকে সরাসরি উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত করার আইনি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বোরিচ নিজে ক্ষতিগ্রস্ত কনসেপসিওন শহর পরিদর্শন করে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম তদারক করেন এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রাতের কারফিউ জারির নির্দেশ দেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন এবং সরকার সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

পরে রাজধানী সান্তিয়াগো ফিরে প্রেসিডেন্ট বোরিচ জানান, দাবানল পরিস্থিতি নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ ও তথ্য বিনিময়ের জন্য তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, কঠিন সময়ে চিলি ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং এই সংকট মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

জাতীয় দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া সংস্থার পরিচালক আলিসিয়া সেব্রিয়ান জানান, সবচেয়ে বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বিয়োবিও অঞ্চলের পেনকো ও লিরকেন শহর থেকে, যেখানে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। তিনি বলেন, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে, তবে বিপুল সংখ্যক মানুষের চাহিদা পূরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দমকল বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে। বিয়োবিও অঞ্চলের বন সংরক্ষণ সংস্থার প্রধান এস্তেবান ক্রাউসে জানিয়েছেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও শক্তিশালী বাতাস আগুনকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁর মতে, বাতাসের দিক পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় আগুনের গতিপথ অনুমান করা যাচ্ছে না, যা অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে। প্রায় চার হাজার দমকলকর্মী দিন-রাত কাজ করলেও প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিলিতে দাবানলের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ-মধ্য চিলিতে দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বনভূমি ও গ্রামীণ জনপদের কাছাকাছি মানব বসতি বিস্তারের ফলে দাবানল দ্রুত আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়ছে, যার পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সান্তিয়াগোর উত্তর-পশ্চিমে ভিনিয়া দেল মার শহরের কাছে একাধিক দাবানলে দেশটি ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সে সময় সরকারি কৌঁসুলির তথ্য অনুযায়ী ১৩৮ জনের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ১৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ঘটনার ক্ষত এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে এই দাবানল চিলির সমাজ ও রাষ্ট্রকে গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

বর্তমান দাবানল শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের একটি নির্মম স্মারক। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ও আরও ভয়াবহ রূপে ফিরে আসতে পারে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও পুনর্বাসন নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ও বন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

দক্ষিণ চিলির পোড়া জনপদগুলোতে এখন নেমে এসেছে এক ধরনের স্তব্ধতা। আগুন নিভে গেলেও মানুষের চোখেমুখে আতঙ্ক, শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছায়া স্পষ্ট। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা পরিসংখ্যানের সংখ্যা নয়—তারা পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, বন্ধু। এই দাবানল চিলির জন্য শুধু একটি জাতীয় সংকট নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য জলবায়ু ঝুঁকির এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত