বরিশালে প্রতিদিন ৯ ডিভোর্স, বিচ্ছেদের আবেদনে এগিয়ে নারীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৪ বার
বরিশালে প্রতিদিন ৯ ডিভোর্স, বিচ্ছেদের আবেদনে এগিয়ে নারীরা

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগরী বরিশালে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। পরিসংখ্যান বলছে, এখানে এখন গড়ে প্রতিদিন নয়টি করে ডিভোর্সের আবেদন জমা পড়ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব বিচ্ছেদের আবেদনে পুরুষদের তুলনায় নারীরাই এগিয়ে রয়েছেন। সামাজিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি শুধু একটি পারিবারিক সংকট নয়, বরং সমাজের গভীরে জমে ওঠা নানা সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।

বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে রেজিস্ট্রি হওয়া বিয়ের প্রায় অর্ধেকই ভেঙে গেছে। ২০২৩ সালে যেখানে ৯ হাজার ৬৬৬টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছিল, সেখানে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৫টি। পরের বছর ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৯৭৮টি বিয়ের বিপরীতে ভেঙেছে ৩ হাজার ৩৪৭টি সংসার। দুই বছর মিলিয়ে মোট ১৮ হাজার ৬৪৪টি বিয়ের মধ্যে ৬ হাজার ৩৫২টি বিচ্ছেদ হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো বরিশালের পারিবারিক কাঠামোর ভাঙনের চিত্র স্পষ্ট করে তুলছে।

বিচ্ছেদের পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে উঠে আসে বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়ার প্রতি আসক্তি, যৌতুকের চাপ, পরকীয়া সম্পর্ক এবং সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মতো বিষয়গুলো। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, তুচ্ছ বিষয় থেকে শুরু হওয়া মনোমালিন্য ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করছে, যা শেষ পর্যন্ত তালাক পর্যন্ত গড়াচ্ছে।

এই সংকটের মানবিক দিকটিও কম ভয়াবহ নয়। বরিশাল মহানগরীর নথুল্লাবাদ এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের ঘটনা তার একটি উদাহরণ। স্ত্রী, সন্তান এবং শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের টানাপোড়েনে একসময় তিনি নিজেকে পুরোপুরি একা অনুভব করতে শুরু করেন। আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে সম্প্রতি কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। রফিকুল ইসলাম বলেন, সংসার জীবনে সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি মনে হয়েছিল। সেই হতাশা থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলাম। তাঁর মতো ঘটনা বরিশালে দিন দিন বাড়ছে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।

আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে সম্পর্ক গড়ে ওঠার ধরনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে প্রেম, আর সেই প্রেম থেকে বিয়ে—এই ধারাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। দুই বছর আগে ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে ঢাকার এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে হয় বরিশালের সালমার। পরিবারের অমতে হলেও শুরুতে সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই যৌতুকের দাবিতে শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এক বছরের মাথায় ভেঙে যায় সেই সম্পর্ক। সালমা বলেন, স্বপ্ন নিয়ে বিয়ে করেছিলাম, কিন্তু সেই স্বপ্ন খুব দ্রুত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।

নারীদের বক্তব্যে উঠে আসছে নির্যাতনের নানা চিত্র। অনেকেই জানান, স্বামীর বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির কারণে সংসারের ভার একসময় তাদের ওপর এসে পড়ে। আবার কেউ কেউ বলছেন, অনলাইন জুয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার কারণে স্বামীদের আচরণ বদলে যায়। এসব পরিস্থিতিতে তারা বাধ্য হয়েই তালাক নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হন। একজন ভুক্তভোগী নারী বলেন, সংসার টিকিয়ে রাখতে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু প্রতিদিনের নির্যাতন সহ্য করা সম্ভব ছিল না।

আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, বরিশাল আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান মৃধা বলেন, বিচ্ছেদের যেন এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রতিদিন আদালতে এ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বাড়ছে। তাঁর ভাষায়, অধিকাংশ মামলার পেছনে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, পারিবারিক সহিংসতা এবং যৌতুকের অভিযোগ রয়েছে। তিনি মনে করেন, আইনের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একই সুরে কথা বলছে। ব্লাস্ট বরিশালের কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শাহিদা বেগম বলেন, ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসন না মেনে চলার প্রবণতা সমাজে বাড়ছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে পরিবারে। তাঁর মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার ও সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সম্পর্কের দায়বদ্ধতা বোঝাতে হবে।

বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার মোহসীন মিয়া জানান, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট দেখা গেছে যে, ডিভোর্স বা তালাকের আবেদনে নারীরাই এগিয়ে রয়েছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান এলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাঁর মতে, এটি সমাজের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ধৈর্যহীনতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা এখন পারিবারিক জীবনে বড় ভূমিকা রাখছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় সম্পর্ক গড়ে তোলা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ভেঙে ফেলার প্রবণতাও বেড়েছে। আগে যেখানে পরিবার ও সমাজ মধ্যস্থতা করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করত, এখন সেখানে অনেকেই সরাসরি বিচ্ছেদের পথ বেছে নিচ্ছেন।

তবে সবাই মনে করছেন না যে বিচ্ছেদ সব সময় নেতিবাচক। কিছু সমাজবিদের মতে, নারীরা এখন আগের চেয়ে সচেতন ও সাহসী হয়েছেন। নির্যাতন ও অসম্মানের মধ্যে জীবন কাটানোর চেয়ে তারা আইনি পথে বেরিয়ে আসাকে বেছে নিচ্ছেন। এই দিক থেকে এটি নারীর ক্ষমতায়নের একটি দিকও নির্দেশ করে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এই বিচ্ছেদের হার কেন এত দ্রুত বাড়ছে?

বরিশালের এই পরিস্থিতি আসলে দেশের সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতারই একটি প্রতিচ্ছবি। কর্মসংস্থানের অভাব, মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি—সব মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে এই সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন মানসিক সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সচেতনতা।

বরিশালে প্রতিদিন গড়ে নয়টি করে ডিভোর্সের ঘটনা শুধু একটি সংখ্যাই নয়, এর প্রতিটি পেছনে রয়েছে ভাঙা স্বপ্ন, আহত মন আর বিপর্যস্ত জীবন। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে—সম্পর্কের মূল্য, দায়িত্ব আর সহনশীলতা নিয়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত