প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ এক ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। রবিবার রাতে উচ্চগতির দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। সোমবারও ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল বলে দেশটির পুলিশ ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো জানিয়েছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও যাত্রী আটকে থাকতে পারেন বলে উদ্ধারকর্মীরা ধারণা করছেন।
স্পেনের রেল কর্তৃপক্ষ আদিফ জানায়, স্থানীয় সময় রবিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি উচ্চগতির ট্রেন কর্দোবা প্রদেশের কাছে পৌঁছালে এর পেছনের অংশ হঠাৎ লাইনচ্যুত হয়। ওই ট্রেনটিতে প্রায় ৩০০ জন যাত্রী ছিলেন। লাইনচ্যুত হওয়া বগিগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী আরেকটি উচ্চগতির ট্রেনের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। সংঘর্ষের তীব্রতায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়।
আন্দালুসিয়া অঞ্চলের প্রধান হুয়ান মোরেনো জানান, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অন্তত ৭৫ জন যাত্রীকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অধিকাংশ আহতকে কর্দোবা শহরের হাসপাতালগুলোতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স মোতায়েন করা হয়েছে। অনেক আহত যাত্রীর শরীরে গুরুতর আঘাত, ভাঙা হাড় এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের লক্ষণ পাওয়া গেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার পরপরই স্পেনের সিভিল গার্ড, সিভিল ডিফেন্স এবং দমকল বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। রাতভর উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করে আনতে ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজ করতে হয়েছে উদ্ধারকর্মীদের। স্পেনের রেড ক্রস দুর্ঘটনাস্থলের কাছের আদামুজ শহরে একটি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। সেখানে দুর্ঘটনায় আহতদের স্বজনদের তথ্য দেওয়া হচ্ছে এবং মানসিক সহায়তাও প্রদান করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, ট্রেনের একাধিক বগি উল্টে পড়ে আছে এবং ধাতব কাঠামো ভয়াবহভাবে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। কোথাও জানালা ভাঙা, কোথাও বগির ছাদ চূর্ণ হয়ে আছে। যাত্রীরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর ভাঙা জানালা দিয়ে কোনোভাবে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন তাঁরা। কেউ কেউ জরুরি হাতুড়ি ব্যবহার করে জানালা ভেঙে জীবন বাঁচান। আতঙ্ক আর আর্তচিৎকারে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
স্পেনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরটিভিইর সাংবাদিক সালভাদোর হিমেনেস দুর্ঘটনাকবলিত একটি ট্রেনেই ছিলেন। ফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এক মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। এরপরই প্রচণ্ড ঝাঁকুনির সঙ্গে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। চারপাশে ধুলা আর ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মানুষজন চিৎকার করছিল, কেউ সাহায্যের জন্য ডাকছিল। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী ওস্কার পুয়েন্তে সোমবার ভোরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি। তিনি ঘটনাটিকে ‘খুবই অস্বাভাবিক’ বলে উল্লেখ করেন। কারণ যে রেলপথে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি একটি সমতল ও আধুনিক লাইন, যা মাত্র গত মে মাসেই সংস্কার করা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, লাইনচ্যুত হওয়া ট্রেনটি চার বছরেরও কম পুরোনো এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন ছিল।
মন্ত্রী পুয়েন্তে ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রথম ট্রেনটির পেছনের অংশ হঠাৎ লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনটির সামনের অংশে আঘাত করে। এতে রেনফে পরিচালিত দ্বিতীয় ট্রেনটির প্রথম দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে প্রায় চার মিটার নিচে পড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ওই ট্রেনটির সামনের অংশে, যেখানে বহু যাত্রী বসেছিলেন। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তদন্ত শেষ হতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, স্পেনে ২৫০ কিলোমিটার গতির বেশি চলাচলকারী ট্রেনের জন্য ইউরোপের সবচেয়ে বড় উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক রয়েছে। দেশটিতে এমন রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য তিন হাজার একশ কিলোমিটারেরও বেশি। এই উচ্চগতির রেলসেবা স্পেনে সাশ্রয়ী, সময় বাঁচানো এবং তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হিসেবে পরিচিত। রেনফে জানিয়েছে, শুধু ২০২৪ সালেই তাদের উচ্চগতির ট্রেনে দুই কোটি পঞ্চাশ লাখের বেশি যাত্রী ভ্রমণ করেছেন।
তবে এই দুর্ঘটনা স্পেনের রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দুর্ঘটনার পর সোমবার মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার বিভিন্ন শহরের মধ্যে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। বহু যাত্রী বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার খোঁজে পড়েন, যার ফলে বাস ও আকাশপথে ভিড় বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, সিগন্যাল ব্যবস্থার সমস্যা বা মানবিক ভুল—যেকোনো একটি বা একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তদন্তে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। স্পেন সরকার নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি শতাব্দীতে স্পেনের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল ২০১৩ সালে। সে সময় দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ৮০ জন নিহত হন। তদন্তে জানা যায়, অনুমোদিত গতির চেয়ে অনেক বেশি গতিতে চলার কারণেই সেই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এবারের দুর্ঘটনাও সেই দুঃসহ স্মৃতি নতুন করে নাড়া দিয়েছে স্পেনবাসীর মনে।
দেশজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে এবং নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন শহরে নীরবতা পালন করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা স্পেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আর না ঘটে।