চূড়ার নাম ৭০০, রশিদের সামনে আর মাত্র ৯ ধাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৫ বার
চূড়ার নাম ৭০০, রশিদের সামনে আর মাত্র ৯ ধাপ

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফগানিস্তান ক্রিকেটের জন্য সময়টা যেন বিশেষ এক সন্ধিক্ষণ। একদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসী পদচারণা, অন্যদিকে বর্তমান দলের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করছে দেশটি। উইন্ডহোকে অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর পরদিনই দুবাইয়ে সিনিয়রদের টি–টোয়েন্টি ম্যাচে একই প্রতিপক্ষকে হারিয়ে সেই বার্তাই দিল আফগানিস্তান। তবে এই জয়ের গল্পে শুধু একটি ম্যাচ বা একটি সিরিজের হিসাব নেই; আছে বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলকের হাতছানি। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আফগান অধিনায়ক ও লেগ স্পিন বিস্ময় রশিদ খান।

টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তান ৩৮ রানের জয় পায়। ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে রশিদ খানের আরেকটি অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া। আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া মিলিয়ে স্বীকৃত টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রথম বোলার হিসেবে ৭০০ উইকেট নেওয়ার পথে আরও দুই ধাপ এগোলেন তিনি। এই ম্যাচ শেষে রশিদের উইকেট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯১। অর্থাৎ, ক্রিকেট ইতিহাসের এক অনন্য চূড়ায় পৌঁছাতে তাঁর দরকার আর মাত্র ৯টি উইকেট।

দুবাইয়ের সেই ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নেমে আফগানিস্তান শুরুটা ভালো করতে পারেনি। মাত্র ১৯ রানের মধ্যেই দুই ওপেনার ফিরে যান প্যাভিলিয়নে। কিন্তু এরপর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে দেন ইব্রাহিম জাদরান ও দারউইশ রাসুলি। তৃতীয় উইকেটে তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ১৬২ রানের জুটি আফগান ইনিংসকে শুধু স্থিতিশীলই করেনি, এনে দিয়েছে বড় সংগ্রহের ভিত। ইব্রাহিম খেলেন ৮৭ রানের পরিণত ইনিংস, আর দারউইশ রাসুলি অপরাজিত থাকেন ৮৪ রানে। এই জুটির ওপর ভর করে ৩ উইকেটে ১৮১ রানের লড়াকু পুঁজি পায় আফগানিস্তান।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। আফগান স্পিন আক্রমণের সামনে ক্যারিবীয়দের টপ অর্ডার দাঁড়াতেই পারেনি। মুজিব উর রহমান ও রশিদ খানের ঘূর্ণিতে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে তারা। রশিদ নিজে নেন ১৯ রানে ২ উইকেট, আর মুজিবের শিকারও ২ উইকেট, খরচ করেন ২৯ রান। পেস আক্রমণে জিয়াউর রহমান নেন ৩ উইকেট। শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ থামে ১৪৩ রানে, আর আফগানিস্তান পায় আত্মবিশ্বাসী এক জয়।

এই ম্যাচে রশিদের অবদান কেবল উইকেট নেওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা ও নিয়ন্ত্রণ আবারও প্রমাণ করেছে কেন তিনি টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে এত ভয়ংকর। আফগানিস্তানের সাত বোলারের মধ্যে রশিদই আদায় করেন সর্বোচ্চ ১৫টি ডট বল। তাঁর বোলিং গড় ১৮.৫৫, যা টি–টোয়েন্টিতে শীর্ষ দশ উইকেটশিকারিদের মধ্যে সেরা। অর্থাৎ, শুধু বেশি উইকেট নয়, কম রানে উইকেট নেওয়ার দিক থেকেও রশিদ আলাদা উচ্চতায়।

টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে রশিদ খানের উত্থান আসলে আধুনিক ক্রিকেটেরই এক প্রতিচ্ছবি। তিনি স্বীকৃত টি–টোয়েন্টিতে দ্রুততম ৪০০, ৫০০ ও ৬০০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। এই সংস্করণে ন্যূনতম ৬০০ উইকেট আছে মাত্র তিনজন বোলারের—রশিদ খান, ডোয়াইন ব্রাভো ও সুনীল নারাইন। ৫০৭ ইনিংসে ৬৯১ উইকেট নিয়ে তালিকার শীর্ষে রশিদ। তাঁর পরেই আছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক অলরাউন্ডার ডোয়াইন ব্রাভো, যিনি ৫৪৬ ইনিংসে নিয়েছেন ৬৩১ উইকেট। সুনীল নারাইনের ঝুলিতে আছে ৫৭৩ ইনিংসে ৬১৩ উইকেট।

এই তালিকায় আরও আছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক লেগ স্পিনার ইমরান তাহির, যিনি ৪৩০ ইনিংসে নিয়েছেন ৫৭০ উইকেট, এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের শক্তিশালী অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেল, যাঁর উইকেট সংখ্যা ৫২১ ইনিংসে ৫০৮। তাঁদের ঠিক পরেই বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান। ৪৬১ ম্যাচে সাকিবের উইকেট ৫০৭। শীর্ষ দশে বাংলাদেশের আরেক প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান, যিনি ৩১৯ ম্যাচে ৪১০ উইকেট নিয়ে আছেন দশম স্থানে। এই তালিকার শীর্ষে রশিদের অবস্থান শুধু আফগানিস্তানের জন্য নয়, উপমহাদেশীয় ক্রিকেটের জন্যও গর্বের।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চলতি সিরিজে আরও দুটি ম্যাচ খেলবে আফগানিস্তান। এই সিরিজেই ৭০০ উইকেটের কীর্তি হয়ে যেতে পারে, আবার নাও হতে পারে। তবে সময়টা খুব দূরে নয়। সামনে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, যেখানে রশিদের সামনে থাকবে আরও বড় মঞ্চ। ২৭ বছর বয়সী এই লেগ স্পিনারের জন্য বিশ্বকাপই হতে পারে ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যেখানে তিনি ছুঁয়ে ফেলবেন ৭০০ উইকেটের চূড়া।

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শুরু হবে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ‘ডি’ গ্রুপে থাকা আফগানিস্তান তাদের সব ম্যাচ খেলবে ভারতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ শেষ করেই বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখবে দলটি। চেন্নাইয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলবে আফগানিস্তান। শক্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই ম্যাচ দিয়েই শুরু হবে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর পর বিশ্বকাপ নিয়ে আশাবাদী রশিদ খান। তিনি বলেন, দল হিসেবে আফগানিস্তান এখন ফিট এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত। সঠিক একাদশ ও ভালো সমন্বয় নিয়ে ভারতে গিয়ে নিজেদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চান তারা। রশিদের কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, কিন্তু তাতে ছিল না বাড়তি অহংকার। বরং একজন অধিনায়কের পরিণত উপলব্ধি—দলগত পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত বড় সাফল্যের চাবিকাঠি।

আফগানিস্তান ক্রিকেট আজ আর কেবল সম্ভাবনার গল্প নয়। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, বিশ্বমানের খেলোয়াড় এবং সাহসী নেতৃত্বে তারা হয়ে উঠছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক দল। আর সেই অভিযাত্রার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন রশিদ খান। ৭০০ উইকেটের চূড়া এখন আর স্বপ্ন নয়, চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তবতা। সামনে মাত্র ৯ ধাপ, আর সেই পথ পেরোলেই ক্রিকেট ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেলবেন আফগানিস্তানের এই লেগ স্পিন জাদুকর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত