কৃষি ব্যাংক ও রাকাব একীভূতকরণে সরকারের নতুন ভাবনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮১ বার
কৃষি ব্যাংক ও রাকাব একীভূতকরণে সরকারের নতুন ভাবনা

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্র মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের পথে এগোচ্ছে সরকার। সেই সংস্কারের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক একীভূত করার চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একটি ধারণাপত্র বা কনসেপ্ট পেপার তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকিং কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। সভায় রাষ্ট্র মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং নগদ আদায়ের অগ্রগতি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। সভার কার্যপত্র থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সূচকগুলো প্রত্যাশিত মানে না পৌঁছানোয় সরকার এখন নীতিগতভাবে কঠোর সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছে।

সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানান, গত ৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ কমাতে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি যাচাই করতেই এই সভা ডাকা হয়। বাস্তবতা হলো, একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি বর্তমানে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক ঋণই নিয়মিত আদায় হচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকটির মূলধন পরিস্থিতিও নাজুক হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ১৮ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। যদিও খেলাপি ঋণের হার কৃষি ব্যাংকের তুলনায় কম, তবুও এটি উল্লেখযোগ্য। ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২০ শতাংশই খেলাপি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে রাকাবের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই ব্যাংকের আর্থিক কাঠামো আলাদাভাবে টিকিয়ে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, যা একীভূতকরণের চিন্তাকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে।

সভায় ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমানত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক তপশিলি ব্যাংক হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারছে এবং সামগ্রিকভাবে আমানতের প্রবৃদ্ধিও সন্তোষজনক। তবে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমানত সংগ্রহ করতে পারে না, যা তাদের তহবিল ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

ঋণ বিতরণের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত তিন অর্থবছরে প্রায় সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ বেড়েছে। তবে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ক্ষেত্রে আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি, যা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তাঁর মতে, সঠিক গ্রাহক নির্বাচন ছাড়া ঋণ বিতরণ বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বাড়বে। তাই নিরাপদ ও টেকসই ঋণনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।

মূলধন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় উঠে আসে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সভায় ব্যাখ্যা দেন যে, আগে ব্যাংকটির প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পুনঃতপশিলকৃত ঋণ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঋণ শ্রেণীকৃত ঋণে রূপান্তর করা হয়েছে। এর ফলে নিয়ম অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে, যা মূলধন ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে তিনি এটিকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও সুশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সভায় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বলেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যদি কম সুদে প্রকল্প ঋণ বা আমানত পাওয়া যায়, তাহলে তাদের মূলধন পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হবে। এ জন্য তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন। অন্যদিকে কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের মূলধন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।

কৃষি ও পল্লী ঋণ খাতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের অর্জন সন্তোষজনক বলে সভায় উল্লেখ করা হয়। তবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই খাতে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে ভালো বলে মূল্যায়ন করা হয়। ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সিএমএসএমই খাতের ঋণগ্রহীতারা সাধারণত ইচ্ছাকৃত খেলাপি হন না, তাই এই খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ানো হলে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ের চিত্রও সভায় উঠে আসে। তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকে। বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ও কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকলেও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কিছু ব্যাংকে খেলাপি ঋণ থেকে নগদ আদায় বাড়লেও অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায় এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

এই প্রেক্ষাপটেই সভায় কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক একীভূত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এই দুই ব্যাংকের কার্যক্রম আরও গতিশীল, জনবান্ধব ও কার্যকর করতে একীভূতকরণ অথবা বিভাগভিত্তিক কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, একই গ্রাহক যেন একাধিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে না পারে, সে জন্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কম সুদে আমানত সংগ্রহ বাড়ানো, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ম্যান্ডেট অনুযায়ী ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ বিতরণে জোর দেওয়া, খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ে পৃথক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নিয়মিত তদারকি করা এবং ঋণসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোর আইন বিভাগকে আরও শক্তিশালী করা হবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের চাপ কিছুটা হলেও কমবে।

সব মিলিয়ে কৃষি ব্যাংক ও রাকাব একীভূত করার ভাবনা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংস্কারের সম্ভাব্য সূচনাবিন্দু। ধারণাপত্রের আলোকে পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটির দিকেই এখন নজর অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত