প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আঞ্চলিক অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সহিংসতার প্রেক্ষাপটে দেওয়া এই বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া এক ভাষণে নেতানিয়াহু স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তেহরান যদি কোনো ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসরাইলের ওপর হামলা চালায়, তাহলে ইসরাইল এমন শক্তি প্রয়োগ করবে, যা ইরান কখনো কল্পনাও করেনি।
নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, তার রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্ক চরম উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে লেবানন, গাজা ও সিরিয়া সীমান্তে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগও নতুন মাত্রা পেয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটেই ইরানকে উদ্দেশ করে এই কঠোর বার্তা দিয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী।
নেসেটে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, সাম্প্রতিক সহিংস পরিস্থিতির পর ইরান আপাতভাবে কিছুটা শান্ত অবস্থায় ফিরে এসেছে বলে মনে হলেও তেল আবিব এক মুহূর্তের জন্যও তেহরানের ওপর নজর সরাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপ ইসরাইল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “যদি তারা ভুল করে এবং আমাদের ওপর আক্রমণ করে, তাহলে আমরা এমন শক্তি ব্যবহার করব, যা তারা কখনো অনুভব করেনি।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইসরাইল যে কেবল আত্মরক্ষার কথা বলছে না, বরং প্রতিশোধমূলক শক্তিশালী হামলার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুর এই হুঁশিয়ারি মূলত ইরানকে ভবিষ্যৎ যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ থেকে নিবৃত্ত করার কৌশলের অংশ। ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। ইসরাইলি নেতৃত্বের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারলে তা শুধু ইসরাইল নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ভারসাম্য নষ্ট করবে।
নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে আরও বলেন, “ইরানের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। কারণ দেশটি আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না।” এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার দিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানে বহু হতাহতের খবর এসেছে, যা দেশটির শাসকগোষ্ঠীর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
এই অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও গভীর অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ওয়াশিংটন একাধিকবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরিয়ে নেওয়ার খবর প্রকাশ পায়। এই খবর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার বিশ্লেষণ করা জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং এর সঙ্গে থাকা অন্যান্য মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সিঙ্গাপুর অতিক্রম করার পর মালাক্কা প্রণালীতে এমন এক পথে অবস্থান করছে, যা তাদের সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশেই যাত্রা করছে এবং ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে তাদের আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি ইরানের জন্য স্পষ্ট বার্তা বহন করছে। একই সঙ্গে এটি ইসরাইলের জন্যও একটি কৌশলগত সমর্থনের ইঙ্গিত। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কোনো বড় সংঘাতে এই দুই দেশের অবস্থান প্রায় একই সারিতে থাকবে—এমনটাই ধারণা আন্তর্জাতিক রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের।
ইসরাইলের এই হুঁশিয়ারিকে অনেকেই প্রতিরোধমূলক কূটনৈতিক ভাষ্য হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে এর প্রভাব শুধু ইরান ও ইসরাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ পুরো অঞ্চলেই এর ঢেউ লাগতে পারে। তেলের বাজার থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরান এখনো এই হুঁশিয়ারির সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তেহরান সাধারণত প্রকাশ্যে শান্ত বার্তা দিলেও আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে থাকে। হিজবুল্লাহ, হামাস বা অন্যান্য গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে তাই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইসরাইল কোনোভাবেই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আপস করতে প্রস্তুত নয়।
সব মিলিয়ে ইরানকে উদ্দেশ করে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর এই হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এটি শুধু দুই দেশের মধ্যকার বক্তব্যের লড়াই নয়, বরং একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ, ওয়াশিংটনের কৌশল এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানের ওপর।