ফ্রান্সের ওয়াইন-শ্যাম্পেনে ২০০% শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬০ বার
ফ্রান্সের ওয়াইন-শ্যাম্পেনে ২০০% শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের

প্রকাশ: ২০  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সুর তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে আবারও বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি। ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের মতো বিশ্ববিখ্যাত পণ্যের ওপর এই বিপুল শুল্ক আরোপের ঘোষণার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক বিরোধ, কূটনৈতিক মতানৈক্য এবং ট্রাম্পের প্রস্তাবিত তথাকথিত ‘শান্তির বোর্ড’ ঘিরে ফ্রান্সের অনীহা।

ট্রাম্পের দাবি, প্যারিস তার উদ্যোগে সাড়া না দিয়েই শুধু থেমে থাকেনি, বরং প্রকাশ্য ও পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ডেনমার্কের অংশ আর্কটিক অঞ্চলের ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড কেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এ বিষয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ব্যাখ্যাকে ফ্রান্সের পক্ষ থেকে উপহাস করার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক আক্রমণের পথে হাঁটার হুমকি দেন।

নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প সরাসরি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে লক্ষ্য করে লেখেন, তিনি ফরাসি ওয়াইন এবং শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন। ট্রাম্পের ভাষায়, “আমি তার ওয়াইন এবং শ্যাম্পেনের উপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করব। তখন তিনি যোগ দিতে চাইবেন। কিন্তু তাকে যোগ দিতে হবে না।” এই বক্তব্যে কেবল বাণিজ্যিক চাপ নয়, বরং রাজনৈতিক চাপে ফেলার কৌশলও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ‘শান্তির বোর্ড’ মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের তত্ত্বাবধানের জন্য গঠনের কথা বলা হলেও আন্তর্জাতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, এই বোর্ডের কার্যপরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইরান, সিরিয়া এবং ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল হিসেবেই অনেকেই এই উদ্যোগকে দেখছেন। তবে ফ্রান্সের আপত্তির জায়গাটিও এখানেই। প্যারিসের মতে, গাজার প্রশ্নে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন কোনো বোর্ড গঠনের উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনার একপর্যায়ে ট্রাম্প ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর কাছ থেকে পাওয়া একটি ব্যক্তিগত বার্তাও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। সেই বার্তায় ম্যাক্রোঁ উল্লেখ করেন, ইরান ও সিরিয়া ইস্যুতে উভয় দেশ অনেকাংশে একমত হলেও গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান তিনি বুঝতে পারছেন না। এই মন্তব্য ট্রাম্পকে আরও ক্ষুব্ধ করেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বৈশ্বিক নেতাদের জমায়েতের প্রসঙ্গও সামনে আসে। ম্যাক্রোঁ সেখানে ট্রাম্প এবং অন্যান্য জি৭ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দেন। এমনকি তিনি ইউক্রেনীয়, ডেনিশ, সিরিয়ান এবং রাশিয়ান প্রতিনিধিদেরও আলোচনায় আমন্ত্রণ জানাতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেন। কূটনৈতিক সৌজন্যের অংশ হিসেবে ট্রাম্পকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানোর কথাও উঠে আসে। তবে এসব সৌজন্যমূলক প্রস্তাবের মধ্যেও মূল বিরোধের জায়গায় কোনো সমঝোতা হয়নি।

একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়, ফ্রান্স ট্রাম্পের বোর্ড অফ পিসের আমন্ত্রণে সাড়া দিতে আগ্রহী নয়। ফরাসি প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই বোর্ডের প্রস্তাবিত সনদ গাজার বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কাঠামোর বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই নীতিগত কারণেই ম্যাক্রোঁ এই উদ্যোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেন শুধু ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, বরং দেশটির রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্র এই পণ্যের অন্যতম বড় বাজার। ফলে ২০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে ফরাসি রপ্তানিকারকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, আবার মার্কিন ভোক্তাদের জন্যও এসব পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠবে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র মঙ্গলবার জানায়, ট্রাম্পের এই শুল্ক হুমকি “অগ্রহণযোগ্য এবং অকার্যকর”। তাদের মতে, বাণিজ্যকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই ফলপ্রসূ হতে পারে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকরাও বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানা গেছে। কারণ ফ্রান্সের ওপর শুল্ক আরোপ মানেই পরোক্ষভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও বাণিজ্য সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলে বাণিজ্যকে চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার নতুন কিছু নয়। অতীতেও তিনি চীন, মেক্সিকো কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন। তবে ফ্রান্সের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ এখানে কেবল বাণিজ্য নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

এই উত্তেজনার প্রভাব ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্স সম্পর্কের ওপর কতটা পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এটা স্পষ্ট যে ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবে রূপ নিলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর ঢেউ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আপাতত বিশ্ব তাকিয়ে আছে—এই হুমকি কি কেবল রাজনৈতিক চাপের কৌশল হিসেবেই থাকবে, নাকি বাস্তবেই ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পথে হাঁটবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত