প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি বিপিএল মৌসুমে একটি নামই যেন আলাদা করে আলো ছড়াচ্ছে—শরীফুল ইসলাম। বাঁহাতি এই পেসার শুধু চট্টগ্রাম রয়্যালসকে ফাইনালে তুলতেই বড় ভূমিকা রাখেননি, বরং নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে বিপিএলের ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় লেখার একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। ১১ ম্যাচে ২৪ উইকেট, গড় মাত্র ৯.৫৪, ইকোনমি ৫.৬—পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, কী ভয়ংকর ধারাবাহিকতা নিয়ে খেলছেন শরীফুল। আর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের শেষ অধ্যায়টি লেখা হতে পারে ফাইনালেই, যেখানে ভাঙতে পারে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড।
এই রেকর্ডের বর্তমান মালিক তাসকিন আহমেদ। গত মৌসুমে দুর্বার রাজশাহীর হয়ে ১২ ম্যাচে ২৫ উইকেট নিয়ে বিপিএলের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির রেকর্ড গড়েছিলেন জাতীয় দলের এই ডানহাতি পেসার। তার আগে দীর্ঘদিন ধরে রেকর্ডটি ছিল সাকিব আল হাসানের দখলে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে ১৫ ম্যাচে ২৩ উইকেট নিয়েছিলেন সাকিব। তাসকিন সেই রেকর্ড ভাঙেন এক বছর আগেই। আর এখন, মাত্র এক মৌসুম পেরোতেই তাসকিনের সেই কীর্তি ছুঁয়ে ফেলেছেন শরীফুল।
আগামী শুক্রবারের ফাইনাল ম্যাচে মাত্র একটি উইকেট পেলেই তাসকিনের পাশে বসবেন শরীফুল। আর দুটি উইকেট নিলে বিপিএলের ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার একক মালিক হয়ে যাবেন চট্টগ্রাম রয়্যালসের এই পেসার। এবারের বিপিএলে যেভাবে বল করছেন, ফাইনালে শরীফুল উইকেটশূন্য থাকলে সেটিই হবে বড় বিস্ময়ের খবর।
এই মৌসুমে শরীফুলের ধারাবাহিকতা চোখে পড়ার মতো। প্রথম কোয়ালিফায়ার পর্যন্ত ১১ ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতেই উইকেট পাননি তিনি। সেটিও ছিল টুর্নামেন্টের শুরুতেই, দ্বিতীয় ম্যাচে। সিলেটে রংপুরের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ২ ওভারে ১৬ রান দিলেও উইকেটের দেখা পাননি শরীফুল। কিন্তু এরপর যেন একেবারে ভিন্ন রূপে দেখা যায় তাঁকে। টানা নয় ম্যাচে উইকেট নেওয়ার পথে একের পর এক ম্যাচে প্রতিপক্ষ ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে মিরপুরে নোয়াখালী এক্সপ্রেসের বিপক্ষে তাঁর পারফরম্যান্স এবারের বিপিএলের সেরা বোলিং ফিগারের একটি হয়ে থাকবে। ৩.৫ ওভারে মাত্র ৯ রান দিয়ে ৫ উইকেট তুলে নেন শরীফুল। ১৫৫ ম্যাচের স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে এটি তাঁর সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। সেই ম্যাচেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই মৌসুমে শরীফুল শুধু ভালো নন, ভয়ংকর কার্যকর।
শুধু উইকেট নেওয়াই নয়, রান আটকে রাখার ক্ষেত্রেও শরীফুল ছিলেন অসাধারণ। প্রথম ১১ ম্যাচের মধ্যে মাত্র চারটিতে তিনি ওভারপ্রতি ৬ রানের বেশি দিয়েছেন। ৭ জানুয়ারি সিলেটে সিলেট টাইটানসের বিপক্ষে ৪ ওভারে ৩৯ রান দেওয়ার পর যেন নিজেকে আরও সংযত করে নেন তিনি। সেই ম্যাচের পর টানা পাঁচ ম্যাচে ওভারপ্রতি ৫ বা তার কম রান দিয়েছেন শরীফুল। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে যেখানে ব্যাটসম্যানরা সবসময় আগ্রাসী থাকার চেষ্টা করেন, সেখানে এমন ইকোনমি ধরে রাখা যে কতটা কঠিন, তা ক্রিকেট বোদ্ধারা ভালোই জানেন।
চট্টগ্রাম রয়্যালসের ফাইনালে ওঠার পেছনেও শরীফুলের অবদান অনস্বীকার্য। নতুন বলে সুইং, মাঝের ওভারে নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ আর ডেথ ওভারে ইয়র্কার ও স্লোয়ারের মিশেলে তিনি প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছেন। অধিনায়ক ও টিম ম্যানেজমেন্টও জানেন, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শরীফুলই দলের সবচেয়ে বড় ভরসা।
এই মৌসুমের পারফরম্যান্স শরীফুলের ক্যারিয়ারের ধারাবাহিক উন্নতিরই প্রতিফলন। এর আগের মৌসুমে দুর্দান্ত ঢাকার হয়ে ১২ ম্যাচে ২২ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি, যা তখনও ছিল একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। এবার সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল। প্রশ্ন ছিল একটাই—তিনি কি তাসকিনের রেকর্ড ছুঁতে বা ভাঙতে পারবেন? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে আর একটি ম্যাচের অপেক্ষা।
বিপিএলের ইতিহাসে এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার তালিকায় তাকালেই বোঝা যায়, কতটা কঠিন এই কীর্তি। সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মুর্তজা, রুবেল হোসেন, তাসকিন আহমেদের মতো অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত বোলারদের নাম রয়েছে এই তালিকায়। সেই তালিকার শীর্ষে নিজের নাম লেখাতে পারলে শরীফুলের জন্য তা হবে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের পেস বোলিং ভবিষ্যতের জন্যও বড় বার্তা।
ফাইনাল ম্যাচ তাই শরীফুলের জন্য দ্বৈত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে। একদিকে দলের জন্য শিরোপা জেতার লড়াই, অন্যদিকে ব্যক্তিগত রেকর্ডের হাতছানি। তবে শরীফুলকে চেনা মানুষরা জানেন, তিনি ব্যক্তিগত মাইলফলকের চেয়ে দলীয় সাফল্যকেই বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু ক্রিকেট এমনই এক খেলা, যেখানে বড় মঞ্চে বড় পারফরম্যান্সই খেলোয়াড়কে ইতিহাসে জায়গা করে দেয়।
শুক্রবারের ফাইনালে যদি শরীফুল তাঁর স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখতে পারেন, তাহলে তাসকিনের রেকর্ড ভাঙা অসম্ভব কিছু নয়। বরং প্রশ্ন উঠছে, তিনি থামবেন কোথায়? এক বা দুই উইকেটেই কি সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি বিপিএলের ইতিহাসে আরও উজ্জ্বল এক অধ্যায় যোগ করবেন? উত্তর মিলবে মাঠেই। তবে এটুকু নিশ্চিত, এবারের বিপিএলের শেষ ম্যাচে সবচেয়ে বেশি আলো থাকবে শরীফুল ইসলামের দিকেই।