প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ চিলির বায়োবিও ও নুবল অঞ্চলে টানা চার দিনের ভয়াবহ দাবানলে অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে পুরো সম্প্রদায় এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়েছে, আর বাতাসে ঘন ধোঁয়া ও পোড়া কাঠের গন্ধ এখনও ছড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জরুরি সহায়তার জন্য আকুতি করছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণে দমকল বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
দক্ষিণ চিলির এই ভয়াবহ দাবানল একটি বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তার পেয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরের সমান। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ দুর্যোগে প্রায় ৭,২০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যদিও সরকার কিছুটা সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেছেন যে বাস্তবে তারা মূলত স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই সাহায্য পাচ্ছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি স্থানীয়দের জন্য এক অকল্পনীয় মানসিক ও শারীরিক চাপে পরিণত হয়েছে।
বায়োবিও অঞ্চলের রাজধানী কনসেপসিওনের কাছে অবস্থিত শহর পুন্তা দে পারার বাসিন্দা ম্যানুয়েল ওরমাসাবাল বলেন, “এ মুহূর্তে একমাত্র ভরসা সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো সহায়তা এখনও পাইনি।” ৬৪ বছর বয়সি ম্যানুয়েল বিদ্যুৎ ও অস্থায়ী শৌচাগারের অভাবে পরিবার ও পোষা প্রাণী নিয়ে একটি তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরছে।
একই রকম হতাশার কথা জানিয়েছেন লিরকেনের বাসিন্দারা। ২৩ বছর বয়সি পশু চিকিৎসক মারিয়া হোসে পিনো বলেন, “মানুষই মানুষকে সাহায্য করছে। সরকারি সহায়তা খুবই সীমিত।” স্থানীয়দের কাছে আশ্রয়, খাবার, পানি এবং চিকিৎসা সরবরাহের সমস্যা এখন এক অতি জরুরি মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
চিলির উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভিক্টর রামোস জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছাতে সব প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ৩৫০ থেকে ১,৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, প্রকৃত সহায়তা এখনও সীমিত এবং অনেকেই মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সাধারণ মানুষের ওপর নির্ভর করছেন।
দমকল বাহিনী পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর রয়েছে। প্রায় ৪,০০০ দমকলকর্মী নুবল, বায়োবিও এবং পার্শ্ববর্তী আরাউকানিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ২১টি সক্রিয় দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। দমকল সমন্বয়কারী হুয়ান কেভেদো জানিয়েছেন, “তাপমাত্রা কমতে থাকায় এবং আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগুনের বিস্তার কিছুটা কমেছে, তবে কয়েক দিনের মধ্যে আবার তীব্র গরম ফিরে আসতে পারে।” উপকূলীয় শহর পেনকো ও লিরকেনের পাহাড়ি এলাকায় শত শত বাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পোড়া গাড়ি, ভাঙা জানালা এবং উড়ে যাওয়া টিনের ছাদ—এ সবকিছুই ভয়াবহতার প্রমাণ।
নিহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজও ধীরগতিতে চলছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত মাত্র পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। অনেক মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ধারণা, কিছু দাবানল ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে। পেনকো এলাকায় অগ্নিসংযোগের চেষ্টার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারির উষ্ণ ও শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-মধ্য চিলিতে দাবানলের ভয়াবহতা বেড়েছে। চলতি বছরের এই দাবানলগুলো ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির পর সবচেয়ে মারাত্মক, যখন ভিনিয়া দেল মার এলাকায় আগুনে ১৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতা ও শুষ্কতার প্রবণতার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন এ অঞ্চলে চরম দাবানল পরিস্থিতি তৈরি করছে।
স্থানীয়দের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা এখন সাধারণ মানুষের সহায়তায় আশ্রয় খুঁজছে। এই বিপর্যয় শুধু মানুষদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে না, বরং তাদের মানসিক ও সামাজিক জীবনেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ঘন ধোঁয়া, তীব্র তাপ এবং খাদ্য–জলের অভাবে এই বিপর্যয় আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
সরকারি ও আন্তর্জাতিক সাহায্য এখন সবচেয়ে জরুরি। দমকল বাহিনী ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছেন আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে, তবে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আবার শঙ্কাজনক হতে পারে। দেশটি এখন মানবিক বিপর্যয় ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে।
দক্ষিণ চিলির এই দাবানল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মানবিক সাহায্য এবং অবিলম্বে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রাথমিক দায়িত্ব। ক্ষতিগ্রস্তদের জীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের সুরক্ষা, বসবাসযোগ্য আশ্রয় এবং প্রাথমিক মানবিক সহায়তা এখন সবচেয়ে জরুরি।
দুর্যোগের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের দুঃখ, পরিবারের হারানো এবং ঘরবাড়ির ধ্বংস মানসিক ও সামাজিক ভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টি করবে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও দেশীয় স্বেচ্ছাসেবীদের তৎপরতা মানবিক সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চিলির এই ভয়াবহ দাবানল প্রমাণ করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে একমাত্র তাত্ত্বিক প্রস্তুতি নয়, কার্যকর ব্যবস্থা ও দ্রুত সহায়তাই প্রাণ রক্ষা করতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষদের জীবনযাত্রা পুনরুদ্ধার এবং পুনর্বাসন এখন চিলির প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।