পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ, প্রকাশ্যে বেকহ্যাম পরিবারের সংকট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৪ বার
পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ, প্রকাশ্যে বেকহ্যাম পরিবারের সংকট

প্রকাশ: ২১  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন, কানাঘুষা আর পরোক্ষ ইঙ্গিতের পর এবার প্রকাশ্যেই ভেঙে পড়ল ‘ব্র্যান্ড বেকহ্যাম’-এর ঝকঝকে পারিবারিক ছবিটি। বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি স্যার ডেভিড বেকহ্যাম ও সাবেক স্পাইস গার্ল ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের বড় ছেলে ব্রুকলিন পেল্টজ বেকহ্যাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—তিনি আর তার পরিবারের সঙ্গে ‘মিলমিশ করতে চান না’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি বাবা–মায়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেন, যা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তীব্র আলোড়ন তুলেছে।

বেকহ্যাম পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। বিশেষ করে ব্রুকলিন ও তার স্ত্রী নিকোলা পেল্টজ বেকহ্যামকে ঘিরে পরিবারে অস্বস্তির বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসে। তবে এতদিন বিষয়টি সরাসরি কেউ স্বীকার করেননি। অবশেষে নীরবতা ভেঙে ব্রুকলিন নিজেই জানালেন, এই সম্পর্কচ্ছেদ তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

ইনস্টাগ্রামে দেওয়া পোস্টে ব্রুকলিন অভিযোগ করেন, তার বাবা–মা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ টিম দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে তাকে ও নিকোলাকে ‘আক্রমণ’ করেছেন। তার ভাষায়, ‘আমাদের সম্পর্ক ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে বারবার।’ তিনি জানান, বহু বছর ধরে পরিস্থিতি ব্যক্তিগত রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাবা–মা যখন একের পর এক সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন, তখন আর চুপ থাকা সম্ভব হয়নি। নিজের বক্তব্যকে তিনি আখ্যা দেন ‘আত্মপক্ষ সমর্থন’ হিসেবে।

ব্রুকলিন লেখেন, ‘আমি আমার পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন চাই না। আমাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে না। জীবনে এই প্রথম আমি নিজের জন্য দাঁড়াচ্ছি।’ এই একটি বাক্যই যেন স্পষ্ট করে দেয়, পরিবার থেকে তার মানসিক দূরত্ব কতটা গভীর। তিনি আরও দাবি করেন, নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য তার পরিবার সংবাদমাধ্যমে অসংখ্য মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে, যার খেসারত দিতে হয়েছে নির্দোষ মানুষকে। তবে সত্য একদিন প্রকাশ পাবেই—এমন বিশ্বাসও ব্যক্ত করেন তিনি।

এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই ডেভিড বেকহ্যাম সরাসরি ছেলের অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য না করলেও, বিষয়টিকে পুরোপুরি উপেক্ষাও করেননি। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সন্তানদের ভুল করার অধিকার আছে এবং ভুল থেকেই তারা শেখে।’ তিনি আরও যোগ করেন, সন্তানদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। যদিও এই মন্তব্যে নাম উল্লেখ না থাকলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি ব্রুকলিনের দিকেই ইঙ্গিত করে।

ব্রুকলিনের অভিযোগের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তার স্ত্রী নিকোলা পেল্টজকে ঘিরে পারিবারিক আচরণ। তার দাবি, ‘আমরা এক হওয়ার যত চেষ্টা করেছি, আমার পরিবার তত বেশি নিকোলাকে অসম্মান করেছে।’ এমনকি তাদের বিয়েটিও ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। ব্রুকলিনের ভাষ্যমতে, ফ্যাশন ডিজাইনার মা ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম শেষ মুহূর্তে নিকোলার বিয়ের পোশাক ডিজাইন করা বাতিল করে দেন, যদিও নিকোলা সেই পোশাক পরতে আগ্রহী ছিলেন। এতে করে হঠাৎ করেই অন্য পোশাকের ব্যবস্থা করতে হয়।

যদিও বিয়ের সময় নিকোলা নিজেই জানিয়েছিলেন, ভিক্টোরিয়ার অ্যাটেলিয়ার সময়মতো পোশাক শেষ করতে পারবে না বুঝেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল এবং তখন পারিবারিক দ্বন্দ্বের কথা অস্বীকার করেছিলেন তিনি। তবে সময়ের ব্যবধানে ব্রুকলিনের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই পুরোনো ঘটনাকে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।

বিয়ের অনুষ্ঠানের আরেকটি ঘটনাও তুলে ধরেছেন ব্রুকলিন, যা নিয়ে আগেও গুঞ্জন ছিল। তার অভিযোগ, প্রথম নাচের সময় লেডি বেকহ্যাম অনুষ্ঠানটি ‘দখল’ করে নেন। তার ভাষায়, স্ত্রী নিকোলার সঙ্গে নাচার কথা থাকলেও, তার মা মঞ্চে এসে তার সঙ্গে নাচতে শুরু করেন এবং সবার সামনে ‘অশোভন আচরণ’ করেন। এই ঘটনায় নিকোলা অপমানিত ও অস্বস্তিতে পড়েছিলেন বলে জানান তিনি।

এই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই ২০২৫ সালে তিনি ও নিকোলা পুনরায় বিয়ের একটি অনুষ্ঠান করেন বলে দাবি করেন ব্রুকলিন। তার মতে, নতুন করে এমন স্মৃতি তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য, যা আনন্দ ও সুখ দেবে—উদ্বেগ বা লজ্জা নয়।

ব্রুকলিন আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন, বিয়ের কয়েক সপ্তাহ আগে তার বাবা–মা তাকে তার নামের অধিকার ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ ও প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। এতে রাজি না হওয়ায় তিনি আর্থিক সুবিধা হারান এবং এরপর থেকেই পরিবারের আচরণ বদলে যায়। এই দাবি ‘ব্র্যান্ড বেকহ্যাম’ ঘিরে থাকা ব্যবসায়িক বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে।

পারিবারিক দ্বন্দ্বের গুঞ্জন আরও জোরালো হয় গত মে মাসে ডেভিড বেকহ্যামের ৫০তম জন্মদিনে ব্রুকলিনের অনুপস্থিতিকে ঘিরে। ব্রুকলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ও নিকোলা জন্মদিন উপলক্ষে লন্ডনে গেলেও এক সপ্তাহ হোটেলে অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, ‘শত অতিথি আর চারদিকে ক্যামেরা থাকা বড় পার্টি ছাড়া বাবা আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতে রাজি হননি।’ এমনকি দেখা করার শর্ত হিসেবে নিকোলার অনুপস্থিতি চাওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি, যা তার কাছে ‘চরম অপমান’ বলে মনে হয়েছে।

অন্যদিকে, সে সময় একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছিল, ব্রুকলিন পার্টিতে যাননি মূলত তার ছোট ভাই রোমিও সেখানে এমন এক নারীর সঙ্গে উপস্থিত থাকার কারণে, যার সঙ্গে ব্রুকলিনের আগে সম্পর্ক ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। এই বিষয়টিও পারিবারিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।

ব্রুকলিন আরও অভিযোগ করেন, তার মা ইচ্ছাকৃতভাবে তার অতীতের নারীদের তাদের জীবনে ফিরিয়ে এনে তাকে ও নিকোলাকে অস্বস্তিতে ফেলতেন। তার মতে, এই পরিবারে সব কিছুর ঊর্ধ্বে ‘ব্র্যান্ড বেকহ্যাম’। তিনি বলেন, ‘পরিবারে ভালোবাসা নির্ধারিত হয় আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা সক্রিয়, তার ওপর।’ এই মন্তব্যে স্পষ্ট, তিনি পরিবারকে একটি আবেগী বন্ধনের বদলে করপোরেট ব্র্যান্ড হিসেবে দেখছেন।

তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন বাবা–মায়ের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে তীব্র উদ্বেগ নিয়ে বড় হয়েছেন তিনি। পরিবার থেকে দূরে আসার পরই প্রথমবার সেই উদ্বেগ কমেছে বলে দাবি করেন ব্রুকলিন। এমনকি অভিযোগ করেন, তাকে ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে এবং সেই অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। তার ছোট ভাইদেরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি, যারা পরে হঠাৎ করেই তাকে ব্লক করে দেন।

যদিও ভাই ক্রুজ বেকহ্যাম গত ডিসেম্বরে দাবি করেন, তাদের বাবা–মা কখনোই সন্তানদের আনফলো করেননি। তার ভাষায়, ‘আমাদের সবাইকেই ব্লক করা হয়েছিল।’ এই বক্তব্য পারিবারিক দ্বন্দ্বের ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরে।

ডেভিড ও ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের চার সন্তান—ব্রুকলিন, রোমিও, ক্রুজ ও হার্পার সেভেন। একসময় যাদের পারিবারিক ছবি ছিল আদর্শ সেলিব্রিটি পরিবারের প্রতীক, আজ সেই পরিবারই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এক তিক্ত বাস্তবতার উদাহরণ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি তারকা পরিবারের দ্বন্দ্ব নয়; বরং আধুনিক সময়ে খ্যাতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতার প্রতিচ্ছবি। ব্রুকলিনের বক্তব্য সত্য হোক বা বিতর্কিত—একটি বিষয় স্পষ্ট, ‘ব্র্যান্ড বেকহ্যাম’-এর আড়ালে থাকা পারিবারিক ফাটল আর গোপন নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত