গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য, পিছু হটার পথ নেই: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য, পিছু হটার পথ নেই: ট্রাম্প

প্রকাশ:২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নিজের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। সোজাসাপ্টা ভাষায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, “পিছনে ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।” তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়েছে।

হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য তিনি কত দূর যেতে প্রস্তুত। উত্তরে ট্রাম্প রহস্যজনক ভঙ্গিতে বলেন, “আপনি সময়মতো জানতে পারবেন।” তার এই বক্তব্য কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করছেন, যাতে সম্ভাব্য সব ধরনের চাপ ও কৌশল প্রয়োগের সুযোগ তার হাতে থাকে।

এই বক্তব্যের মধ্যেই ইউরোপের শীর্ষ নেতারা দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সেখানে সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব দ্রুত একটি “নিয়মবিহীন ব্যবস্থার দিকে” এগিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, “পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা আর ফিরে আসছে না।” এই মন্তব্যগুলো ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়, বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প নিজেও দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। বুধবার তার সেখানে পৌঁছানোর কথা, এবং তিনি ইতিমধ্যে জানিয়েছেন যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সেখানে “অনেক বৈঠক” হতে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউস সূত্র জানায়, ট্রাম্প এই সফরকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তার মতে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, খনিজ সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ সামরিক ভারসাম্যের জন্য গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব অপরিসীম।

একই দিনে দেওয়া প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সবকিছু “বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে।” যদিও তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি, তবে তার এই মন্তব্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক ও কৌশলগত উভয় পর্যায়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।”

এই প্রসঙ্গে ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে বিবিসির এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে ন্যাটো জোটে বিভক্তি তৈরি হলে তার মূল্য দিতে তিনি প্রস্তুত কি না। উত্তরে ট্রাম্প বলেন, “ন্যাটোর জন্য আমার চেয়ে বেশি কেউ করেনি, সব দিক দিয়ে।” তিনি আরও দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এলে ন্যাটোও উপকৃত হবে এবং বিশ্ব নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প ন্যাটো নিয়ে নিজের পুরোনো সন্দেহও প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর প্রয়োজনে সবসময় এগিয়ে এসেছে, কিন্তু তার প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনে ন্যাটোর সদস্যরা আদৌ এগিয়ে আসবে কি না। এই বক্তব্য ন্যাটোর মূল ভিত্তি, সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ন্যাটো বা উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বর্তমানে ৩২টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত। যুক্তরাষ্ট্র এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। ডেনমার্কও ন্যাটোর সদস্য, আর গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী, কোনো এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হয়। ট্রাম্পের বক্তব্যের পর বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে ন্যাটোর এই নীতি কীভাবে কার্যকর হবে।

গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি ট্রাম্প। মঙ্গলবার এনবিসি নিউজ তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছিল, প্রয়োজনে তিনি কি শক্তি প্রয়োগ করবেন। জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না। তার এই নীরবতাই অনেকের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডেনমার্ক সরকার অবশ্য শুরু থেকেই স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তারা একাধিকবার জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড কোনোভাবেই বিক্রির জন্য নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ডেনিশ নেতারা এটিকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেও এই ইস্যুতে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন। তার মতে, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বাড়ছে, আর এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করা জরুরি। গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা এবং বিরল খনিজ সম্পদ ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটিকে অত্যন্ত মূল্যবান করে তুলেছে।

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইউরোপের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে। একাধিক ইউরোপীয় দেশের বিরুদ্ধে নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন তিনি। ইউরোপীয় নেতারা আশঙ্কা করছেন, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়লে ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্ক আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রথম দিনেই ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেইন সরাসরি আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে জানান, আর্কটিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ইউরোপ “সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”। তার বক্তব্য অনেকটাই ট্রাম্পের অবস্থানের প্রতি একটি কূটনৈতিক জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের এই আগ্রাসী বক্তব্য কেবল একটি ভূখণ্ড দখলের প্রশ্ন নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে লড়াইয়ের প্রতিফলন। আর্কটিক অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদ, নতুন নৌপথ এবং সামরিক উপস্থিতি—সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ট্রাম্পের “পিছনে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই” মন্তব্য সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত