সাগরের ৪০০ মিটার নিচে ইতিহাস গড়ছে নরওয়ে, রগফাস্ট টানেলের মহাযজ্ঞ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ বার
সাগরের ৪০০ মিটার নিচে ইতিহাস গড়ছে নরওয়ে, রগফাস্ট টানেলের মহাযজ্ঞ

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশাল সমুদ্র, নিরব গভীরতা আর মানুষের অদম্য প্রকৌশল দক্ষতা—এই তিনের সমন্বয়ে ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় রচনা করতে চলেছে নরওয়ে। উত্তর সাগরের প্রায় ৪০০ মিটার গভীরে নির্মাণাধীন ‘রগফাস্ট’ নামের সড়কসুড়ঙ্গটি শুধু দেশটির নয়, বরং বিশ্ব প্রকৌশল ইতিহাসেরই অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জনচক্ষুর আড়ালে, অথচ অবিশ্বাস্য সাহস আর প্রযুক্তিগত দক্ষতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে এই নির্মাণযজ্ঞ।

রগফাস্ট মূলত নরওয়ের পশ্চিম উপকূলজুড়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন, ফেরিবিহীন সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অংশ। পাহাড়, ফিয়র্ড আর দ্বীপে ভরা এই দেশে দীর্ঘদিন ধরেই যাতায়াতের বড় বাধা ছিল ফেরিনির্ভর যোগাযোগ। আবহাওয়া খারাপ হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, কখনো যাত্রা স্থগিত—এমন অভিজ্ঞতা নরওয়ের মানুষের কাছে নতুন নয়। রগফাস্ট টানেল সেই বাস্তবতাকেই বদলে দিতে চায়।

ইতোমধ্যে কঠিন শিলা কেটে সুড়ঙ্গ খননের কাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সড়কসুড়ঙ্গের মোট দৈর্ঘ্য হবে ২৭ কিলোমিটারেরও বেশি এবং এর গভীরতম অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৩৯২ থেকে ৪০০ মিটার নিচে অবস্থান করবে। এ গভীরতা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে গভীর সমুদ্রতল সড়কসুড়ঙ্গের মর্যাদা দেবে, যেখানে গাড়ি বা রেল চলাচল সম্ভব হবে।

এই প্রকল্পের অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রগফাস্ট শুধু দৈর্ঘ্য বা গভীরতার জন্য নয়, বরং এর প্রকৌশলগত জটিলতার কারণেও ব্যতিক্রমী। সমুদ্রের এত গভীরে কাজ করা মানে শুধু পাথর কাটা নয়, বরং প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা।

রগফাস্ট নামটি এসেছে নরওয়েজীয় শব্দ ‘রোগাল্যান্ড ফাস্টফোরবিনডেলসে’ থেকে। রোগাল্যান্ড অঞ্চলকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার লক্ষ্য থেকেই এই নামকরণ। এই টানেল র‍্যান্ডাবার্গ ও বোকন অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে এবং এটি উপকূলীয় মহাসড়ক ই৩৯-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। ই৩৯ সড়কটি নরওয়ের উত্তরের ত্রোনহাইম থেকে দক্ষিণের ক্রিস্তিয়ানসান্দ পর্যন্ত বিস্তৃত, যার মোট দৈর্ঘ্য এক হাজার ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি।

বর্তমানে এই দীর্ঘ পথে চলাচল করতে গিয়ে চালকদের সাতটি ফেরি পারাপার করতে হয়। প্রতিটি ফেরি মানেই অপেক্ষা, সময় ও অনিশ্চয়তা। নরওয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো সেতু ও সড়কসুড়ঙ্গ নির্মাণের মাধ্যমে এই ফেরিনির্ভরতা ধীরে ধীরে বন্ধ করা। রগফাস্ট সেই পরিকল্পনার সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রকৌশলগত দিক থেকে রগফাস্ট এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সুড়ঙ্গটির সবচেয়ে গভীর অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৩৯২ মিটার নিচে নামবে। এত গভীরে পানির চাপ বিপুল, আর শিলার ভেতরের ক্ষুদ্র ফাটল দিয়েও লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সিএনএনের তথ্যমতে, প্রকৌশলীরা সুড়ঙ্গটির উভয় প্রান্ত থেকে একসঙ্গে খননকাজ শুরু করেছেন। এর অর্থ, সমুদ্রের তলায় দুই দিক থেকে এগিয়ে আসা খনন দলগুলোকে শেষ পর্যন্ত প্রায় নিখুঁতভাবে এক জায়গায় মিলিত হতে হবে।

এই মিলন ঘটানোর ক্ষেত্রে ত্রুটিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র পাঁচ সেন্টিমিটারের কম। এত বিশাল গভীরতা ও কঠিন শিলার ভেতরে কাজ করে এমন নির্ভুলতা বজায় রাখা বিশ্বমানের প্রকৌশল দক্ষতারই প্রমাণ। সামান্য ভুল মানেই সময় ও অর্থের অপচয়, এমনকি পুরো প্রকল্পের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

সমুদ্রের নিচে সুড়ঙ্গ নির্মাণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো পানির চাপ সামলানো। যত গভীরে খনন এগোচ্ছে, তত বাড়ছে শিলার ভেতরের চাপ ও পানির প্রবেশের আশঙ্কা। রগফাস্টের উত্তর অংশ নির্মাণ করছে সুইডিশ বহুজাতিক নির্মাণ ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান স্কানস্কা। প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক অ্যান ব্রিট মোয়েন সিএনএনকে জানিয়েছেন, খননের সময় এরই মধ্যে কয়েকবার পানি ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে।

এই পরিস্থিতিতে গ্রাউটিং পদ্ধতি বা শিলার ফাটল সিল করার কৌশল আরও উন্নত করতে হয়েছে। গভীরে যত কাজ এগোচ্ছে, তত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে। উত্তরের এই অংশটির দৈর্ঘ্য প্রায় নয় কিলোমিটার এবং এখানেই রয়েছে সুড়ঙ্গের সবচেয়ে গভীর অংশগুলো।

নকশার দিক থেকেও রগফাস্ট ব্যতিক্রমী। এটি দুটি আলাদা টিউবের সমন্বয়ে তৈরি হবে, প্রতিটি টিউবে দুই লেনে যানবাহন চলাচল করবে। সুড়ঙ্গের প্রায় অর্ধেক অংশে একটি বিশেষ ভূগর্ভস্থ সংযোগস্থল থাকবে, যেখানে চালকেরা দিক পরিবর্তন করতে পারবেন বা অন্য সংযোগ সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে পারবেন। এই সংযোগস্থলটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২৬০ মিটার নিচে অবস্থিত এবং এখান থেকে একটি শাখা সুড়ঙ্গ নরওয়ের সবচেয়ে ছোট পৌরসভা কভিৎসোয় দ্বীপের দিকে যাবে।

টানেলের ভেতরের বাতাসের মান নিয়ন্ত্রণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য উন্নত বায়ুপ্রবাহ ব্যবস্থার নকশা করা হয়েছে। দুর্ঘটনা শনাক্ত ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে থাকবে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম, ক্যামেরা ও রাডার। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও রগফাস্ট একটি বড় বিনিয়োগ। এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। তবে অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কায় ২০১৯ সালে সাময়িকভাবে কাজ স্থগিত করা হয়। পুনঃপর্যালোচনার পর ২০২১ সালে আবার পূর্ণোদ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৩ সালের মধ্যে এই সড়কসুড়ঙ্গ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি নরওয়েজীয় ক্রোনার, যা প্রায় ২৪০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ফেরি পারাপারসংক্রান্ত কিছু কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। তবে প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোয়েনের মতে, উন্নত সড়ক যোগাযোগ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। যাতায়াত সহজ হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জনসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়বে। পাশাপাশি সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্প খাতও উপকৃত হবে, কারণ পরিবহন খরচ ও সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

মোয়েন মনে করেন, রগফাস্টের প্রভাব রাতারাতি দৃশ্যমান হবে না। ধীরে ধীরে এই সড়কসুড়ঙ্গ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বদলে দেবে, অঞ্চলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমাবে এবং নরওয়ের উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রগফাস্ট প্রকল্প শুধু নরওয়ের যোগাযোগব্যবস্থায় নয়, বিশ্ব প্রকৌশল জগতেও একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে। সমুদ্রের প্রায় ৪০০ মিটার নিচে মানুষের তৈরি এই সড়কসুড়ঙ্গ প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তি আর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকলে প্রকৃতির গভীরতাও মানুষের চলার পথ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত