প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন নানা আলোচনা ও বিতর্ক চলমান, ঠিক সেই সময় ক্ষমতার সীমা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি নতুন করে সামনে আনলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যারা শাসনব্যবস্থায় বা ক্ষমতায় আসবেন, তারা যেন নিজেদের রাজা-বাদশা মনে না করেন। জনগণের ভোটেই ক্ষমতার বৈধতা আসে, আর সেই জনগণের কাছেই ক্ষমতার জবাবদিহি থাকতে হবে।
বুধবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের মির্জা রুহুল আমিন মিলনায়তনে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে গণভোট প্রচারণা বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। সভায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো আয়োজনজুড়েই গণভোট, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণ। জনগণের ভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার নির্ধারিত হয়। ক্ষমতায় গিয়ে কেউ যদি নিজেকে রাজা-বাদশা মনে করেন, তাহলে সেই শাসনব্যবস্থা আর গণতান্ত্রিক থাকে না। তাঁর ভাষায়, “আপনি যদি হ্যাঁ ভোট না দেন, আমরা মনে করি আপনি একটি সেঞ্চুরি মিস করবেন।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জনগণকে সক্রিয়ভাবে গণভোটে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও কথা বলেন। ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমান কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির কার্যত কোনো ক্ষমতা নেই। সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত। যদি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ভাগাভাগি থাকত, তাহলে অতীতে স্বৈরাচারী প্রবণতা তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে যেত। তাঁর মতে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দুই সাংবিধানিক পদে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকলে একক সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল ইচ্ছা একটি সুন্দর, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই প্রকৃত অর্থে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই জায়গা থেকে সীমিত ভূমিকা পালন করছে। “আমাদের দায়িত্ব যতটুকু ছিল, আমরা শেষ করে চলে যেতে চাই,”—এমন মন্তব্য করে তিনি বোঝান, এই সরকার ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার জন্য নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ সুগম করার জন্য কাজ করছে।
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচিত সরকার যেভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে সেভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কারণ নির্বাচিত সরকারের পেছনে থাকে জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট। সেই ম্যান্ডেট ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণ বা বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন। তাই তিনি জনগণকে আহ্বান জানান, গণভোট ও নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করুন।
মতবিনিময় সভায় তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক দল যদি প্রকাশ্যে ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে ভোটারদের উচিত সেই দলের উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবা। তিনি বলেন, জনগণের ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কোন দল কী বলল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের নিজস্ব বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত।
ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আপনি যদি হ্যাঁ ভোট না দেন, আমরা মনে করি একটি সেঞ্চুরি মিস করা।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, গণভোটে অংশগ্রহণ এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে দেশ একটি বড় সুযোগ পেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় থেকে যারা অপব্যবহার করতে চাইবে, তারাই সাধারণত না ভোটের পক্ষে অবস্থান নেবে। কারণ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি হলে ক্ষমতার অপব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি একই সঙ্গে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তাঁর ভাষায়, “আমরা চাই না হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটুক।” গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা যেন কখনোই সহিংসতায় রূপ না নেয়। শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ ও ভোটাধিকার প্রয়োগই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
সভায় বক্তারা বলেন, গণভোট শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনগণকে গণভোট সম্পর্কে সচেতন করতে এবং অংশগ্রহণ বাড়াতে সারাদেশে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ভোটাররা যেন ভয়ভীতি ছাড়া কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। জনগণের সচেতন অংশগ্রহণই পারে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।
মতবিনিময় সভা শেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গণভোট ও নির্বাচন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই মনে করছেন, এই ধরনের খোলামেলা বক্তব্য জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। ক্ষমতায় গিয়ে কেউ যেন রাজা-বাদশা হয়ে উঠতে না পারে—এই বার্তাটি গণভোটের প্রাক্কালে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।