বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করল ইরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
ইরান বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ নীরবতার পর দেশজুড়ে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা প্রথমবারের মতো প্রকাশ করল ইরান সরকার। বুধবার ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল প্রেস টিভি জানায়, সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভে মোট তিন হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ এতদিন ধরে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নানা ধরনের তথ্য ও অনুমান ঘুরপাক খাচ্ছিল।

প্রেস টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের শহীদ ফাউন্ডেশন নিহতদের তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে দুই হাজার ৪২৭ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে আলাদা করে বিস্তারিত সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। সরকার পক্ষ বলছে, এই বিক্ষোভ ছিল শুধু সাধারণ প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে সহিংস রূপ নেয় এবং এতে রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

ইরান সরকার বরাবরের মতোই এই আন্দোলনের পেছনে বিদেশি শক্তির ভূমিকার অভিযোগ এনেছে। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ছিল ‘বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড’, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করা। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী আকবর পৌরজামশিদিয়ান প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নিহতদের মধ্যে যারা সহিংসতা, দাঙ্গা ও সন্ত্রাসে জড়িত ছিলেন, তাদের আলাদা করে ‘সন্ত্রাসী-দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এরা সরকারি ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে।

তবে সরকার ঘোষিত এই সংখ্যাকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানে নিহত হয়েছেন চার হাজার ৫৬০ জন। সংস্থাটি দাবি করছে, তাদের এই হিসাব মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। সরকার ঘোষিত সংখ্যার সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের বড় ধরনের পার্থক্য নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান সরকারের এই প্রথমবার নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করা একদিকে যেমন স্বচ্ছতার একটি সীমিত ইঙ্গিত, অন্যদিকে এটি আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার কৌশলও হতে পারে। কারণ বিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই পশ্চিমা দেশগুলো ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে আসছিল। নিহতের সংখ্যা প্রকাশ না করায় ইরানকে তথ্য গোপনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছিল।

এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় গত ২৮ ডিসেম্বর। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অসহনীয় মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবন, ব্যাংক, নিরাপত্তা চৌকি ও সামরিক স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া যায়। সরকার দাবি করছে, এই সহিংসতার পেছনে সংগঠিত চক্র কাজ করেছে এবং তারা বিদেশি শক্তির ইন্ধনে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে।

অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশের দাবি, সরকারের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও দুর্নীতিই এই ক্ষোভের মূল কারণ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অনেক নাগরিকের মতে, সরকারের কঠোর দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।

বিক্ষোভ চলাকালে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো এবং গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদারের অভিযোগও উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এসব পদক্ষেপের ফলে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যার কারণে নিহত ও আটক ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা সহজ নয়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও বিক্ষোভকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন এবং তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন। সরকার পক্ষের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ সংযম দেখিয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরাও এর শিকার হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মহলে এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতির স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই বিক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। দেশটির শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক চাপ মোকাবিলার বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। তবে একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও কড়াকড়ি করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, নিহতের সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে ইরান সরকার এক নতুন অধ্যায় শুরু করলেও বিতর্ক শেষ হয়নি। সরকার ঘোষিত সংখ্যা ও মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যানের ফারাক স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকারের বড় একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন এবং নাগরিক অসন্তোষ মোকাবিলার কৌশলের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত