আফকন জয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান: মানেদের ঘর বানাতে দিল সরকার জমি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৪ বার
আফকন জয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান: মানেদের ঘর বানাতে দিল সরকার জমি

প্রকাশ: ২২  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকান ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট আবারও সেনেগালের মাথায়। মরক্কোর রাবাতে নাটকীয় ও বিতর্কে ভরা এক ফাইনালের পর আফ্রিকান কাপ অব নেশন্স (আফকন) শিরোপা জিতে দেশে ফিরেছে ‘লায়ন্স অব তেরেঙ্গা’। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, আবেগ আর গর্বে ভাসা এই জয়ের পর রাজধানী ডাকারে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা ছিল ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকার মতো। রাস্তার দুই পাশে মানুষের ঢল, জাতীয় পতাকা হাতে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই এক কণ্ঠে উদযাপন করেছে তাদের নায়কদের প্রত্যাবর্তন। সেই উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দেশের সবচেয়ে বড় তারকা সাদিও মানে এবং তার সতীর্থরা।

আফকন জয়ের পরপরই সেনেগাল সরকার ফুটবল দলকে যে রাষ্ট্রীয় সম্মান দিয়েছে, তা দেশটির ক্রীড়া ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রেসিডেন্ট বাসিরো দোমায়ো ফায়ে নিজ উদ্যোগে জাতীয় দলকে সংবর্ধনা জানান। শুধু আর্থিক পুরস্কারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। ফুটবলার, কোচিং স্টাফ ও সংশ্লিষ্ট অফিসিয়ালদের জন্য বাড়ি তৈরির উদ্দেশ্যে জমি উপহার দেয়ার ঘোষণাও আসে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে। ক্রীড়াঙ্গনে দেশের সম্মান সমুন্নত রাখার এই স্বীকৃতি সেনেগালবাসীর কাছে শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং জাতীয় গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রাবাতের প্রিন্স মাওলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচটি ছিল আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত। ম্যাচজুড়ে নাটকীয়তা, রেফারিং বিতর্ক আর আবেগঘন মুহূর্ত একসঙ্গে মিশে যায়। সেনেগালের একটি গোল বাতিল হওয়া এবং প্রতিপক্ষের পক্ষে বিতর্কিত পেনাল্টি সিদ্ধান্ত ম্যাচের উত্তেজনা চরমে পৌঁছে দেয়। এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠ ছাড়ার মতো ঘটনাও ঘটে, যা নিয়ে পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্সেই সব প্রশ্নের জবাব দেয় সেনেগাল। চাপের মুখেও দারুণ মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়ে তারা তুলে নেয় মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি।

শিরোপা হাতে দেশে ফেরার পর সেই সব বিতর্ক যেন আনন্দের জোয়ারে চাপা পড়ে যায়। ছাদখোলা বাসে ট্রফি হাতে ফুটবলারদের বহর যখন ডাকারের রাজপথে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন চারদিক থেকে ধ্বনিত হচ্ছিল জয়ধ্বনি। সমর্থকদের ভালোবাসা আর আবেগে ভেসে যায় পুরো শহর। সাদিও মানে, কালিদু কুলিবালি, এদুয়ার মেন্দি—একেকজন তারকা যেন হয়ে ওঠেন লাখো মানুষের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।

এই ঐতিহাসিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে প্রেসিডেন্ট বাসিরো দোমায়ো ফায়ের প্রাসাদে আয়োজন করা হয় বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। সেখানে আফকন ট্রফি প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেন দলের অধিনায়ক। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ক্রীড়া সংগঠক ও বিশিষ্টজনেরা। প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে খেলোয়াড়দের সাহস, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

তিনি ঘোষণা দেন, আফকন জয়ের জন্য খেলোয়াড়, কোচ ও অফিসিয়ালদের প্রত্যেককে ৭৫ মিলিয়ন ফ্রাঁক আর্থিক পুরস্কার দেয়া হবে। পাশাপাশি তাদের প্রত্যেকের জন্য বাড়ি তৈরির উপযোগী জমি বরাদ্দ করা হবে। প্রেসিডেন্টের ভাষায়, দেশের জন্য যারা এমন গৌরব বয়ে এনেছেন, তাদের সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, মাঠের ভেতরের বিতর্কিত ঘটনাগুলো ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়াই বড় পরিচয়। ভবিষ্যতে যেন সেনেগাল ফুটবল শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, সে আহ্বানও জানান তিনি।

সেনেগালের এই আফকন জয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আরেকটি কারণে। ২০২১ সালের পর আবারও মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে দলটি প্রমাণ করেছে, তাদের সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ধারাবাহিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী খেলোয়াড় গঠন ও মানসিক দৃঢ়তাই তাদের বড় শক্তি। প্রেসিডেন্ট বাসিরো দোমায়ো ফায়ে তার বক্তব্যে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন এবং আগামী বিশ্বকাপেও একই মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

এই জয়ের আবেগে সবচেয়ে বেশি সিক্ত হয়েছেন সাদিও মানে। দেশের ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় এই তারকা ক্যারিয়ারের শেষ আফ্রিকান কাপ অব নেশন্স খেলেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। ফলে সমর্থকদের ভালোবাসা যেন তার জন্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। ডাকারের রাজপথে মানেকে এক ঝলক দেখার জন্য মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেছে। অনেকের চোখে জল, অনেকের কণ্ঠে আবেগ—সব মিলিয়ে এটি ছিল একজন নায়কের প্রতি জাতির ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সেনেগাল সরকারের এই সম্মাননা কেবল খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে। ফুটবলকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার সাহস পাবে তরুণরা। রাষ্ট্র যখন ক্রীড়াবিদদের পাশে দাঁড়ায়, তখন সেটি পুরো ক্রীড়া ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।

আফকন শিরোপা জয় এবং তার পরবর্তী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সেনেগালকে আফ্রিকার ফুটবল মানচিত্রে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিতর্ক, উত্তেজনা আর চাপের মধ্যেও যেভাবে দলটি নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছে, তা কেবল একটি ট্রফির গল্প নয়; এটি একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের গল্প। এখন চোখ আগামী বিশ্বকাপের দিকে। সমর্থকদের বিশ্বাস, আফ্রিকার এই সিংহেরা বিশ্বমঞ্চেও তাদের গর্জন শোনাতে প্রস্তুত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত