ক্ষোভের আগুনে নিভে গেল পাঁচ বছরের আরিফা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
ক্ষোভের আগুনে নিভে গেল পাঁচ বছরের আরিফা

প্রকাশ:  ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর কুড়িল মৃধাবাড়ি এলাকার একটি ভাড়া বাসা যেন মুহূর্তেই রূপ নেয় বিভীষিকাময় এক ট্র্যাজেডির নীরব সাক্ষীতে। সেখানে পানির ট্যাংকের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় পাঁচ বছর বয়সী শিশু আরিফার নিথর দেহ। শিশুটির চোখে-মুখে ছিল না কোনো প্রতিরোধের চিহ্ন, ছিল কেবল নিষ্ঠুর এক বাস্তবতার ছাপ। পুলিশ জানিয়েছে, পারিবারিক ক্ষোভ ও ঈর্ষা থেকেই আরিফাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে তারই ভাবি, পরে মরদেহ লুকাতে ফেলে দেওয়া হয় বাসার পানির ট্যাংকে।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে বুধবার, ২১ জানুয়ারি। সন্ধ্যার দিকে স্থানীয়দের সহায়তায় ভাটারা থানা পুলিশ শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে। পরে তা ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত করেছে, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়—একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

নিহত আরিফা শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার সিদুলকুড়া গ্রামের রাজিব ও হাবেজা বেগম দম্পতির মেয়ে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট, পরিবারের আদরের কেন্দ্রবিন্দু। জীবিকার তাগিদে পরিবারটি রাজধানীর কুড়িল মৃধাবাড়ি এলাকায় জহিরের বাড়িতে ভাড়া থাকত। মাত্র কয়েক দিন আগেই স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল আরিফা। নতুন ব্যাগ, নতুন জামা আর স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন—সবকিছুই থেমে গেল নির্মম এক ঘটনায়।

ভাটারা থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মওদুদ কামাল জানান, ওই বাসায় বসবাস করতেন দিনমজুর রাজিব ও তার স্ত্রী হাবেজা বেগম, তাদের দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং বড় ছেলের স্ত্রী খাদিজা আক্তার। বুধবার সকালে পরিবারের অন্য সদস্যরা কাজে বেরিয়ে গেলে বাসায় একা ছিল আরিফা ও তার ভাবি। এই সুযোগেই ঘটে যায় ভয়াবহ ঘটনাটি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, খাদিজা আক্তার দীর্ঘদিন ধরেই আরিফার প্রতি বিরক্ত ছিলেন। বিশেষ করে আরিফার ভাই হাসান যখন বোনের জন্য বাইরে থেকে খেলনা বা কিছু নিয়ে আসতেন, তা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়তেন তিনি। ঘটনার আগের রাতেও হাসান আরিফার জন্য একটি প্লাস্টিকের পুতুল ও ফুল নিয়ে আসেন। সেটি নিয়েই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে রাতভর ঝগড়া হয়। সেই ক্ষোভই পরদিন সকালে ভয়ংকর রূপ নেয়।

বুধবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আরিফাকে একা পেয়ে ঘরের ভেতরেই তার গলা চেপে ধরেন খাদিজা। প্রায় তিন থেকে চার মিনিট ধরে শ্বাসরোধ করে রাখার একপর্যায়ে শিশুটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তখনই নিজের কোলে করে আরিফার মরদেহ তুলে নিয়ে বাসার পাশের পানির ট্যাংকে ফেলে দেন তিনি।

ঘটনার কিছুক্ষণ পরই আরিফার মা হাবেজা বেগম কাজ থেকে বাসায় ফিরে মেয়েকে দেখতে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বাড়ির পাশের একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করেন। কিন্তু ফুটেজে দেখা যায়, আরিফা বাসা থেকে বাইরে যায়নি। তখনই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

শেষ পর্যন্ত বাসার ভেতর ও আশপাশে পুনরায় খোঁজ শুরু করলে পানির ট্যাংকের ভেতর থেকে উদ্ধার হয় আরিফার নিথর দেহ। শিশুটির গলায় শ্বাসরোধের স্পষ্ট দাগ ছিল, ঠোঁটেও ফোলা ও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরিস্থিতি বুঝে পরিবারের সদস্যরা খাদিজাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেন।

পুলিশ জানায়, খাদিজাকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এবং পরে পুলিশ হেফাজতেও তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত শিশুর পরিবার একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে।

এই ঘটনায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রতিবেশীরা কেউই বিশ্বাস করতে পারছেন না, এমন নৃশংস ঘটনা একটি ঘরের ভেতর, পরিবারের একজনের হাতেই ঘটতে পারে। অনেকেই বলছেন, সামান্য পারিবারিক ক্ষোভ ও ঈর্ষা কীভাবে একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নিতে পারে, এই ঘটনা তার ভয়াবহ উদাহরণ।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পারিবারিক সহিংসতা ও মানসিক অস্থিরতার বিষয়গুলোকে সমাজে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিবারিক পরিবেশে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও বলছেন, এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন ভয়ংকর কাজ করার সাহস না পায়।

আরিফার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই একটি গভীর ক্ষত। স্কুলে যাওয়ার আগেই, জীবনের রঙিন স্বপ্ন দেখার আগেই তার জীবন থেমে গেল। একটি নিষ্পাপ মুখের হাসি চিরতরে হারিয়ে গেল ক্ষোভ আর নিষ্ঠুরতার অন্ধকারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত