ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের যাত্রা শুরু, যোগ দিল যেসব দেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭০ বার
ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের যাত্রা শুরু, যোগ দিল যেসব দেশ

প্রকাশ: ২২  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির অস্থির প্রেক্ষাপটে নতুন এক আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বহুল আলোচিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেন। ট্রাম্প নিজেই প্রথমে এই পর্ষদের সনদে স্বাক্ষর করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্তত ২০টি দেশের প্রতিনিধিরা এতে স্বাক্ষর করেন বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনে একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের দাবি সামনে এলো, যদিও উদ্যোগটি নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, তথাকথিত এই শান্তি পর্ষদের লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে চলমান ও সম্ভাব্য সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানে ভূমিকা রাখা। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, এই পর্ষদ একটি স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে কাজ করবে এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কাঠামোর পাশাপাশি সংঘাত নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সনদে স্বাক্ষরের পর হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, শান্তি পর্ষদের যাত্রা শুরু হওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। তাঁর ভাষায়, এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উদ্যোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম।

সনদে স্বাক্ষর শেষে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, শান্তি পর্ষদের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই পর্ষদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন, শান্তি পর্ষদ জাতিসংঘের সঙ্গেও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে পারে। তাঁর মতে, জাতিসংঘের বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় হলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী হবে।

হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার জন্য প্রায় ৫০টি দেশকে আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৫টি দেশের নেতা এই উদ্যোগে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মতি বা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও দাভোসে প্রাথমিকভাবে সনদে স্বাক্ষর করেছে তুলনামূলক কমসংখ্যক দেশ, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, অচিরেই আরও দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবে।

এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান, কাতার ও মিশর। অঞ্চলটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এসব দেশের একসঙ্গে একটি শান্তি উদ্যোগে যুক্ত হওয়া আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার কৌশলের অংশ হিসেবেও এই পর্ষদকে দেখা যেতে পারে।

ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্য থেকে তুরস্ক ও হাঙ্গেরি শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ইউরোপীয় রাজনীতিতে এই দুই দেশের অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বরাবরই আলোচিত। বিশেষ করে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই উদ্যোগের মাধ্যমে। ইউরোপের বাইরেও আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ শান্তি পর্ষদে যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মরক্কো, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, কসোভো, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, প্যারাগুয়ে ও ভিয়েতনাম। এসব দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য দেখিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, শান্তি পর্ষদ সত্যিকারের বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে শান্তি পর্ষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে কয়েকটি দেশের শীর্ষ নেতাদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান, প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট শান্তিয়াগো পেনা, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, কসোভোর প্রেসিডেন্ট জোসা ওসমানি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, বুলগেরিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী রোশেন জেলিয়াজোভ এবং আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের উপস্থিতি এই আয়োজনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। এসব নেতার অংশগ্রহণের মাধ্যমে ট্রাম্প বোঝাতে চেয়েছেন যে, শান্তি পর্ষদে শুধু পশ্চিমা দেশ নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে প্রশ্ন ও সমালোচনাও কম নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, শান্তি পর্ষদের কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং বাস্তব কার্যক্রম এখনও স্পষ্ট নয়। জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি নতুন একটি পর্ষদ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের একটি কৌশল হিসেবেও দেখছেন, বিশেষ করে তাঁর আগের মেয়াদে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে।

অন্যদিকে, ট্রাম্প সমর্থকদের দাবি, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন চিন্তা ও নতুন কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। তাঁদের মতে, প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণেই অনেক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। শান্তি পর্ষদ সেই জড়তা ভাঙতে পারে এবং আলোচনার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, দাভোসে ট্রাম্পের ঘোষিত শান্তি পর্ষদের যাত্রা শুরু বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি আদৌ কতটা কার্যকর হবে, নাকি রাজনৈতিক প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে—তা নির্ভর করবে আগামী দিনগুলোতে পর্ষদের কার্যক্রম, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আন্তরিকতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর। তবে এই মুহূর্তে এটুকু স্পষ্ট, শান্তি পর্ষদের ঘোষণা বিশ্ব কূটনীতির অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায় যোগ করেছে, যার প্রভাব আগামী দিনে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত