সরস্বতী পূজা আজ, অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করার দিন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
সরস্বতী পূজা আজ, অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করার দিন

প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজ শুক্রবার, হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব সরস্বতী পূজা। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে প্রতিবছরের মতো আজও অগণিত ভক্ত বিদ্যা, বুদ্ধি ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর আরাধনায় মেতে উঠেছেন। বাঙালি সংস্কৃতিতে এই দিনটি কেবল একটি ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবিক চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক অনন্য উপলক্ষ।

সরস্বতীকে বলা হয় বাগদেবী—যিনি মানুষের বাকশক্তি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতীক। বিশ্বাস করা হয়, তাঁর কৃপায় অজ্ঞতার অন্ধকার দূর হয় এবং মানুষের মনে জ্ঞানের আলো উদ্ভাসিত হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মন্দির, মণ্ডপ ও ঘরে ঘরে দেবীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করছেন ভক্তরা। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের কাছে সরস্বতী পূজার তাৎপর্য আরও গভীর ও আবেগঘন।

সরস্বতী পূজা উপলক্ষে আজ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বই-খাতা, কলম, বীণা ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী সাজিয়ে দেবীর পূজা করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী এই দিনে ‘হাতেখড়ি’ বা বিদ্যার সূচনালগ্নের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে, যা বাঙালি হিন্দু সমাজে একটি পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী রীতি। অভিভাবকরাও আশা করেন, দেবীর আশীর্বাদে তাঁদের সন্তানরা বিদ্যা ও নৈতিকতায় আলোকিত হয়ে উঠবে।

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই সরস্বতী পূজাকে ঘিরে দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে আজ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হচ্ছে এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হচ্ছে সরস্বতী পূজার তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভক্তরা শুভেচ্ছা ও উৎসবের মুহূর্ত ভাগ করে নিচ্ছেন।

ঢাকা মহানগরীতে সরস্বতী পূজার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে আজ সকাল থেকেই ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে এখানে কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপ স্থাপন করা হয়েছে। মন্ত্রোচ্চারণ, পুষ্পাঞ্জলি, আরতি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হচ্ছে। ভক্তদের নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খলভাবে পূজা সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা চোখে পড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সরস্বতী পূজা একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল মাঠে স্থাপিত কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপে সকাল থেকেই পূজার আয়োজন চলছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগ ও আবাসিক হলের উদ্যোগে পৃথক পূজামণ্ডপ স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। অনেক শিক্ষার্থী ঐতিহ্যবাহী বাসন্তী বা হলুদ শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে পূজায় অংশ নিচ্ছেন, যা এই উৎসবের নান্দনিকতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মন্দিরগুলোতেও আজ সরস্বতী পূজা ঘিরে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, ওয়ারীর রামসীতা মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দিরে পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। অনেক স্থানে পূজা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যের মাধ্যমে দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে।

গ্রামবাংলাতেও সরস্বতী পূজার আবেদন কম নয়। ছোট ছোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাঠশালা ও বাড়ির আঙিনায় স্থাপিত মণ্ডপে শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনেক জায়গায় স্থানীয়ভাবে চাঁদা তুলে পূজার আয়োজন করা হয়, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি করে। পূজাকে ঘিরে গ্রামীণ সমাজেও আজ আনন্দ ও উৎসবের আবহ বিরাজ করছে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সরস্বতী পূজা বাঙালি সংস্কৃতিতে জ্ঞানের মর্যাদা ও শিক্ষার গুরুত্বের প্রতীক। এই দিনে দেবীর আরাধনার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও অন্ধকার দূর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরস্বতী পূজার মূল শিক্ষা হলো—জ্ঞানচর্চা, যুক্তিবোধ ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। এই দর্শন ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসে সরস্বতী পূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মানুষ এই উৎসবে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই পূজামণ্ডপে গিয়ে সম্মান জানান। এতে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয় এবং সহাবস্থানের সংস্কৃতি শক্তিশালী হয় বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

আজকের এই দিনে অনেক শিক্ষার্থী নতুন করে স্বপ্ন দেখেন, জীবনের লক্ষ্য ঠিক করেন। পরীক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও গবেষকরাও দেবীর আশীর্বাদ কামনা করে প্রার্থনায় অংশ নেন। কেউ কেউ প্রতিজ্ঞা করেন নিয়মিত অধ্যয়ন ও সৎ পথে চলার। এই প্রতিজ্ঞাই সরস্বতী পূজাকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং আত্মউন্নয়ন ও মননশীলতার এক অনুপ্রেরণার দিনে পরিণত করে।

সরস্বতী পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার জ্ঞান, শিক্ষা ও নৈতিকতায়। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে আলোকিত সমাজ গড়ার যে আহ্বান এই পূজা বহন করে, তা আজকের সময়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সেই শিক্ষাই যেন আমাদের জীবন ও সমাজে প্রতিফলিত হয়—এটাই আজকের দিনের মূল প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত