প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন অধ্যায়। দ্বাদশ আসরের ফাইনালে দাপুটে পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতেছে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে রীতিমতো আধিপত্য দেখিয়ে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে ৬৩ রানে হারিয়ে বিপিএলের ২০২৬ আসরের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বাধীন দলটি। অভিষেক আসরেই শিরোপা জয়ের এই কীর্তি রাজশাহীর ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ফাইনালের মঞ্চে শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। শুরুটা কিছুটা সতর্ক হলেও ইনিংসের মাঝপথে দৃশ্যপট বদলে দেন তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের সঙ্গে আক্রমণাত্মক শট নির্বাচনে তিনি পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেন। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেটে ১৭৪ রান সংগ্রহ করে রাজশাহী, যা ফাইনালের প্রেক্ষাপটে প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাট থেকে আসে এক অনন্য ইনিংস। ৬২ বলে ঠিক ১০০ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। এই ইনিংসে ছিল ৬টি চার এবং ৭টি বিশাল ছক্কা। টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি করার পাশাপাশি বিপিএল ফাইনালের মঞ্চে নিজের তৃতীয় শতক হাঁকিয়ে বিশেষ কীর্তিও গড়েন এই বাঁহাতি ওপেনার। চাপের ম্যাচে এমন ইনিংস খেলতে পারা তার মানসিক দৃঢ়তা ও ম্যাচ সচেতনতারই প্রমাণ বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা।
রাজশাহীর ইনিংসে তানজিদের বাইরে আর কেউ বড় স্কোর করতে না পারলেও মাঝারি অবদান রাখেন কয়েকজন অভিজ্ঞ ব্যাটার। সাহিবজাদা ফারহান ৩০ বল খেলে ৩০ রান করেন। নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন ১৫ বলে ২৪ রান যোগ করেন দলের মোট সংগ্রহে। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ইনিংসের শেষদিকে দ্রুত রান তুলতে গিয়ে শেষ বলে আউট হলেও দলের জন্য তার কৌশলগত নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম রয়্যালসের বোলিংয়ে মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ ও শরিফুল ইসলাম দুটি করে উইকেট নেন। বিশেষ করে শরিফুলের বোলিং ছিল ধারাবাহিকভাবে আক্রমণাত্মক। ইনিংসের শেষ বলে শান্তকে আউট করে তিনি শুধু রাজশাহীর ইনিংস থামাননি, বরং একটি ঐতিহাসিক রেকর্ডও নিজের করে নেন।
১৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় চট্টগ্রাম রয়্যালস। রাজশাহীর বোলাররা নিখুঁত লাইন ও লেন্থে বল করে ব্যাটারদের ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন। ওপেনার নাঈম শেখ ছিলেন দলের বড় ভরসা। কিন্তু মাত্র ১০ বলে ৯ রান করে ফিরে গেলে ভেঙে পড়ে চট্টগ্রামের ব্যাটিং কাঠামো। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি, ফলে রান তোলার গতি কখনোই গড়ে ওঠেনি।
চট্টগ্রামের হয়ে সর্বোচ্চ রান আসে ওপেনার মির্জা বেগের ব্যাট থেকে। ৩৬ বল খেলে ৩৯ রানের ইনিংস খেললেও তাকে সঙ্গ দেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। আসিফ আলী করেন ২১ রান। হাসান নাওয়াজ ও জাহিদুজ্জামান সাগর করেন ১১ রান করে। এর বাইরে কেউ দুই অঙ্কের ঘরও ছুঁতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ১৭.৫ ওভারে মাত্র ১১১ রানেই অলআউট হয়ে যায় চট্টগ্রাম রয়্যালস।
রাজশাহীর বোলিং আক্রমণ ছিল ম্যাচের বড় পার্থক্য গড়ে দেওয়া উপাদান। শ্রীলঙ্কান পেসার বিনুরা ফার্নান্দো ছিলেন দুর্দান্ত। মাত্র ৩ ওভারে ৯ রান খরচ করে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন তিনি। তার গতিময় ও সুইং করা ডেলিভারিতে চট্টগ্রামের ব্যাটাররা একের পর এক ভুল শট খেলতে বাধ্য হন। স্পিন বিভাগে হাসান মুরাদ ১৫ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেন। পাশাপাশি জিমি নিশাম ২টি উইকেট তুলে নিয়ে চট্টগ্রামের শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দেন।
এই জয়ে ৬৩ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। অভিষেক আসরেই শিরোপা জিতে দলটি প্রমাণ করেছে সঠিক পরিকল্পনা, ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন এবং চাপ সামলানোর মানসিকতা থাকলে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজিও বড় সাফল্য পেতে পারে।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও এই বিপিএল ছিল স্মরণীয়। শরিফুল ইসলাম পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ছিলেন ভয়ংকর ফর্মে। ১২ ম্যাচে ২৬ উইকেট নিয়ে তিনি বিপিএলের এক আসরে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের নতুন রেকর্ড গড়েন। তার সেরা বোলিং ছিল ৯ রানে ৫ উইকেট। এর আগে গত আসরে তাসকিন আহমেদ ১২ ম্যাচে ২৫ উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। মাত্র এক আসরের ব্যবধানে সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন শরিফুল। টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও উঠেছে তার হাতে।
ফাইনালের ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন তানজিদ হাসান তামিম। তার শতক শুধু ম্যাচ জয়ের পথই সহজ করেনি, বরং বিপিএল ফাইনালের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন হয়ে থাকবে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপিএল প্রমাণ করেছে যে ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে উঠে আসা তরুণদের ওপর আস্থা রাখলে তারা বড় মঞ্চে সাফল্য এনে দিতে পারে। রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের শিরোপা জয় শুধু একটি দলের সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা।
উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হওয়া এবারের বিপিএল দর্শকদের উপহার দিয়েছে রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা এবং নতুন চ্যাম্পিয়নের গল্প। রাজশাহীর এই জয় নিশ্চিতভাবেই বিপিএলের ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব নিয়ে স্মরণ করা হবে।