প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুরের পীরগঞ্জে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার সকাল আটটায় কবর জিয়ারত শেষে তিনি শহীদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং শহীদ আবু সাঈদের বাবা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি শহীদের আত্মত্যাগকে জাতির জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শহীদদের পথ অনুসরণ করেই দেশকে আগামীর দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
কবর জিয়ারত শেষে মোনাজাতে অংশ নিয়ে জামায়াত আমির মহান আল্লাহর কাছে শহীদ আবু সাঈদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। মোনাজাতে তিনি বলেন, হে আল্লাহ, শহীদ আবু সাঈদ আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। তুমি তাকে তোমার রহমতের ছায়ায় রাখো এবং আমাদের দেশকে সব ধরনের আধিপত্যবাদ থেকে হেফাজত করো। তিনি আরও বলেন, আমাদেরকেও শহীদদের পথে চলার তৌফিক দান করো, যেন আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকতে পারি।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি সমগ্র জাতির জন্য এক গভীর বেদনা ও একই সঙ্গে এক শক্তির উৎস। তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষী, যেসব জাতি শহীদদের আত্মত্যাগকে ধারণ করে সামনে এগিয়েছে, তারাই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে। শহীদ আবু সাঈদের রক্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার বিনামূল্যে আসে না, এর জন্য চরম মূল্য দিতে হয়।
শহীদের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে জামায়াত আমির আবু সাঈদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, এই পরিবার শুধু একজন সন্তান হারায়নি, জাতি হারিয়েছে একজন সাহসী যোদ্ধাকে। তিনি শহীদের বাবার হাত ধরে বলেন, আপনার সন্তান দেশের জন্য জীবন দিয়েছে, এই ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। জাতি আপনাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। এ সময় শহীদের বড় ভাই আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আবু সাঈদ সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলত এবং দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিল।
এই কর্মসূচিতে জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আকতার হোসেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাদের উপস্থিতি শহীদ আবু সাঈদের প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে দেখা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত জামায়াত আমিরের উত্তরবঙ্গ সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় শহীদদের স্মরণ করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আবেগী সংযোগ তৈরি করার কৌশল হিসেবেও এটিকে দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই সফর রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন তারা।
কবর জিয়ারত শেষে ডা. শফিকুর রহমান জানান, শহীদদের আদর্শকে সামনে রেখেই তারা রাজনীতি করতে চান। তিনি বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে কাউকে জীবন দিতে হবে না। কিন্তু যদি কখনো সেই পরিস্থিতি আসে, তবে শহীদ আবু সাঈদের মতো সাহস নিয়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।
শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত শেষে জামায়াত আমিরের দিনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। তিনি সকাল দশটায় গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলায় নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। এরপর দুপুর বারোটায় বগুড়া শহরে, দুপুর আড়াইটায় বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলায়, বেলা সাড়ে তিনটায় সিরাজগঞ্জ শহরে এবং বিকেল চারটায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সমাবেশে অংশ নেবেন। দিনের শেষ কর্মসূচি হিসেবে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় পাবনা শহরে একটি বড় নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে তার।
উত্তরবঙ্গ সফর ঘিরে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় নেতারা জানান, শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত কর্মসূচি নেতাকর্মীদের আবেগ আরও দৃঢ় করেছে। তারা মনে করছেন, শহীদদের স্মরণ করেই রাজনীতির মাঠে নৈতিক অবস্থান জোরালো করা সম্ভব।
শহীদ আবু সাঈদ আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের এক সাহসী প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তার আত্মত্যাগ আজও অনেক তরুণকে আন্দোলন ও সংগ্রামের পথে অনুপ্রাণিত করছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও তার সাহস ও ত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার কবর জিয়ারত করেন। জামায়াত আমিরের এই সফর সেই ধারাবাহিক শ্রদ্ধারই একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি ছিল আবেগ, স্মৃতি ও রাজনৈতিক প্রত্যয়ের মিলনমেলা। এই জিয়ারতের মধ্য দিয়ে শহীদদের আদর্শকে সামনে রেখে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথাই নতুন করে উচ্চারিত হলো।