ভূখণ্ড ইস্যুতে অচলাবস্থা, আবুধাবি আলোচনায় সমঝোতা হয়নি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩ বার
ভূখণ্ড ইস্যুতে অচলাবস্থা, আবুধাবি আলোচনায় সমঝোতা হয়নি

প্রকাশ:  ২৪  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রায় তিন বছর ধরে চলমান রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আশায় আন্তর্জাতিক মহলে যখন নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে, ঠিক সেই সময়েই প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় বসল দুই দেশের প্রতিনিধিরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে ঘিরে বৈশ্বিক পর্যায়ে তৈরি হয়েছিল সতর্ক আশাবাদ। তবে ভূখণ্ড প্রশ্নে অনড় অবস্থানের কারণে সেই আশার আলো দ্রুতই ম্লান হয়ে গেছে। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে কোনো ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং আলোচনার মূল বিষয় দোনবাস ও দখলকৃত ভূখণ্ড নিয়েই দুই পক্ষের অবস্থান যে এখনও সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল ভূখণ্ড ইস্যুতে প্রথম কোনো সরাসরি ও আনুষ্ঠানিক আলোচনা। বৈঠক শুরুর আগেই কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছিল, এটি হবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল আলোচনা, যেখানে দ্রুত কোনো অগ্রগতি প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বৈঠকের ফলাফল সেই ধারণাকেই সত্য প্রমাণ করেছে।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, দোনবাস অঞ্চল পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া রাশিয়ার জন্য একটি ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ শর্ত। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এই অঞ্চল নিয়ে কোনো আপস করতে প্রস্তুত নয় মস্কো। রয়টার্সকে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, মস্কো তথাকথিত ‘অ্যাঙ্কোরেজ ফর্মুলা’ বিবেচনা করছে। এই ফর্মুলার আওতায় দোনবাস রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে বর্তমানে যে যুদ্ধরেখা রয়েছে, সেটিকেই স্থায়ী সীমারেখা হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত যুদ্ধের মাধ্যমে দখল করা ভূখণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই প্রস্তাবকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় ভূখণ্ড বিরোধই ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়। তাঁর ভাষায়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়াকে এই যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত হতে হবে—যে যুদ্ধ তারা নিজেরাই শুরু করেছে। জেলেনস্কি আরও জানান, তিনি আলোচক দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, তবে শুক্রবারের বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট, ইউক্রেন এখনো সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের প্রশ্নে একচুলও ছাড় দিতে রাজি নয়।

ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব এবং প্রতিনিধিদলের প্রধান রুস্তেম উমেরভ বৈঠক শেষে বলেন, আলোচনায় যুদ্ধ অবসানের শর্ত এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে। যদিও তিনি আলোচনার পরিবেশকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়’ বলে উল্লেখ করেন, তবুও কোনো বাস্তব অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এই আলোচনা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়ার একটি প্রাথমিক ধাপ হলেও, বাস্তব সমাধানে পৌঁছাতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

ভূখণ্ড ইস্যুর পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন। রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের রুশ সম্পদের একটি বড় অংশ দখলকৃত ইউক্রেনীয় এলাকাগুলোর পুনর্গঠনে ব্যবহার করা যেতে পারে। মস্কোর যুক্তি, এই অর্থ দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। তবে ইউক্রেন এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা এই প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের দাবি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই অর্থ রাশিয়াকেই দিতে হবে, দখলকৃত এলাকায় নিজেদের শর্তে তা ব্যবহারের কোনো অধিকার মস্কোর নেই।

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই প্রস্তাবকে ‘অর্থহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, যে দেশ যুদ্ধ শুরু করেছে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তারা আবার ক্ষতিগ্রস্ত দেশের সম্পদ ব্যবহার করে পুনর্গঠনের কথা বলছে—এটি নৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। ইউক্রেনের এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আবুধাবির এই বৈঠক দেখিয়ে দিয়েছে যে, যুদ্ধ বন্ধের পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখনো ভূখণ্ড প্রশ্ন। রাশিয়া বাস্তব নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে নতুন সীমারেখা স্থায়ী করতে চায়, আর ইউক্রেন চায় আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তার সার্বভৌম ভূখণ্ড সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার করতে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে আপাতত কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে কূটনীতিকদের একাংশ মনে করেন, সরাসরি আলোচনা শুরু হওয়াটাই একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রেই সমাধান খোঁজার চেষ্টা হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আবুধাবির বৈঠক অন্তত সেই ধারাবাহিকতার বাইরে এসে রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। যদিও সেই দরজা এখনো পুরোপুরি বন্ধ বা খোলা—কোনোটাই বলা যাচ্ছে না।

বিশ্ব রাজনীতিতে এই আলোচনার প্রভাবও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি দেখাচ্ছে, ওয়াশিংটন এখনো এই সংঘাতে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে চায়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই বৈঠক আয়োজন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাদের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আবুধাবির আলোচনায় যুদ্ধ বন্ধের কোনো তাৎক্ষণিক পথরেখা তৈরি হয়নি। বরং ভূখণ্ড প্রশ্নে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অনড় অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে। তবুও এই বৈঠক ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে, আবুধাবির এই বৈঠক তারই একটি প্রমাণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত