প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ না করার ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে যে সংকট সৃষ্টি করেছে, তা আরও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সামাল দেওয়া যেত বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশরাফুল হক। তার মতে, রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আপত্তি তুলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ক্রিকবাজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা হয়তো রাজনৈতিকভাবে একটি অবস্থান জিতেছি, কিন্তু ক্রিকেটের যুদ্ধে হেরে গেছি।” আশরাফুল হকের ভাষায়, দলের বিশ্বকাপ থেকে অব্যাহতি কার্যত দেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পিছিয়ে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, বিসিবি যখন আলোচনার টেবিলে শুরুতেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে—শ্রীলঙ্কায় না হলে খেলব না—তাহলে সেটি একটি বড় কৌশলগত ভুল ছিল। এই অবস্থানের ফলে ভারতীয় চরমপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কৌশলের ফাঁদে বাংলাদেশ পা দিয়েছে।
সৈয়দ আশরাফুল হক আরও বলেন, “বর্তমান সংকটের ক্ষেত্রে বোর্ড পুরোপুরি সরকারের সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আন্তর্জাতিক রীতিতে নিরাপত্তা ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত ছিল খেলোয়াড়দের হাতে। যেকোনো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ক্রিকেট বোর্ড আইসিসির নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরে বলত—যারা নিরাপদ মনে করে, তারা যাবে। যারা যাবে না, তারা যাবেন না। কোনো শাস্তি হবে না। কিন্তু এখানে সেই সুযোগই খেলোয়াড়দের দেওয়া হয়নি।”
তিনি মনে করেন, বিসিবি সরকারের কাছে তাদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকার একটি অস্থায়ী সময়ে থাকায় বোর্ডকে আরও কৌশলগত ও সাবধানীভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হতো। এর ফলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান বিপন্ন হয়েছে।
আশরাফুল হক আরও সতর্ক করেছেন, বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না। বাংলাদেশকে এখন একটি সুসংহত জনসংযোগ ও কূটনৈতিক কার্যক্রম চালাতে হবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আইসিসির বৈঠকে বাংলাদেশ মাত্র একটি ভোট পায়—এটাই দেশের ক্রিকেটের অবস্থান বুঝিয়ে দেয়।
অন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশ আদালতে বিষয়টি নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি খুব আশাবাদী নন। তার মতে, আইসিসি বলবে, “আগের সব বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই হয়েছে। আইসিসি সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা মূল্যায়ন করেছে এবং সবার কাছে সুপারিশ দিয়েছে—এই মুহূর্তে ভারতে কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই।” বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একমাত্র যুক্তি হবে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে খেলতে না দেওয়ার বিষয়। কিন্তু আইসিসির পাল্টা যুক্তি হবে, আইপিএল একটি স্থানীয় টুর্নামেন্ট; তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
সাবেক বিসিবি কর্মকর্তা মনে করেন, মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের দলে না রাখার পেছনে মূল কারণ রাজনৈতিক—পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতে কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি কর্তৃপক্ষ। এই পদক্ষেপের কারণে দলের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ সংক্রান্ত প্রমাণগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্কিত হয়ে গেছে।
আশরাফুল হক উল্লেখ করেছেন, আইসিসির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে এবং মূল্যায়ন আইসিসির দায়িত্ব। এছাড়া, বাংলাদেশের বিপুল দর্শকসংখ্যা বিশ্বকাপ সম্প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি বাংলাদেশ অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সম্প্রচারস্বত্ব সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ দাবিও আইসিসির অধীনে থাকতে পারে।
তিনি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন। তবে সতর্ক করেছেন, তা না হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। আশরাফুল হকের ভাষায়, “এটা ঠিক না হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের মৃত্যু ঘটবে।”