প্রকাশ: ১৪ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও এবার তা এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাম্প্রতিক প্রস্তাবে স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ বা ‘সিনেট’-এর ৭৬টি আসনে জনগণের সরাসরি ভোটে সদস্য নির্বাচন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার দ্বিতীয় দফার সংলাপের ১৩তম দিনে কমিশনের পক্ষ থেকে উচ্চকক্ষ গঠনের এই কাঠামো তুলে ধরা হয়। সংলাপে অংশগ্রহণ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতৃবৃন্দ, এবং তাদের উপস্থিতিতে উত্থাপিত প্রস্তাবটি এক নতুন দিকনির্দেশনার জন্ম দেয়।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলা ও ১২টি সিটি করপোরেশন—এই দুই ধরনের প্রশাসনিক একককে পৃথক পৃথক নির্বাচনি এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিটি এলাকা থেকে একজন করে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হবেন। ফলে সর্বমোট ৭৬টি নির্বাচনি এলাকা থেকে ৭৬ জন সদস্য সরাসরি জনগণের ভোটে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন।
এছাড়া, জাতীয় সংসদ (নিম্নকক্ষ) ও সিনেট (উচ্চকক্ষ)-এর নির্বাচন একযোগে আয়োজনের সুপারিশও এসেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে, নির্বাচন পরিচালনা, ব্যয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠবে—এমনটাই আশা করছে কমিশন।
এই প্রস্তাবের ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিশনের আগের সুপারিশ, যেখানে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছিল। ওই সুপারিশে বলা হয়, উচ্চকক্ষ মূলত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে যুক্তিবাদী পর্যালোচনা ও যাচাইয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। পাশাপাশি, নির্বাহী শাখার কার্যক্রমের ওপর একটি ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষার ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে।
সংলাপ শেষে একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তাদের মতে, দেশের গণতন্ত্রের বিকাশে এবং জাতীয় স্বার্থে একটি উচ্চকক্ষ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে যখন সরকার পরিচালনায় জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। কয়েকটি ছোট দল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, উচ্চকক্ষ গঠনের নামে একটি রাজনৈতিক অলিগার্কির পুনঃপ্রতিষ্ঠা হতে পারে, যেখানে আবারও প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রাধান্য পাবে। তবে কমিশন আশ্বস্ত করেছে যে, এই প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক এবং সকল দলের সমমর্যাদার ভিত্তিতে।
বিশেষজ্ঞ মহল বলছে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে এক নতুন সংসদীয় ধারার সূচনা হবে, যেখানে আইন প্রণয়ন, বিতর্ক ও মূল্যায়নের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে। উচ্চকক্ষ আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোর ওপর গভীরতর পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করবে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের কী ধরনের কাঠামো প্রয়োজন হবে এবং সংসদে কী পরিমাণ রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠবে? কারণ, দ্বিকক্ষ সংসদ গঠনের জন্য ১৯৭২ সালের সংবিধানের একাধিক ধারা সংশোধন করতে হবে।
প্রস্তাবটি এখন জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেই এই কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন কমিশনের এক সদস্য।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। দ্বিকক্ষীয় আইনসভা বাস্তবায়িত হলে এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্বিতীয় বৃহৎ গণতান্ত্রিক কাঠামো, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত এবং নীতিনির্ধারণ আরও গভীরতর হবে।