প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফেনীর সোনাগাজীতে ফুটবল খেলার মাঠে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক স্কুলছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরা একটি ক্রীড়ানুষ্ঠান মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের ঘটনায়। গতকাল শুক্রবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের সাতবাড়িয়া গ্রামে ঘটে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। নিহত কিশোরের নাম সাঈদ হোসেন (১৬)। সে ওই গ্রামের নাছির আহমেদের ছেলে এবং স্থানীয় মতিগঞ্জ আর এম হাট কে উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাতবাড়িয়া গ্রামের হেকিম ডাক্তার বাড়ির পাশের খোলা মাঠে শুক্রবার রাতে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। শীতের রাতে গ্রামের কিশোর-তরুণদের অংশগ্রহণে জমে ওঠে খেলা। আশপাশের মানুষজনও খেলা দেখতে মাঠে ভিড় করেন। সাঈদ হোসেন ছিল এই ম্যাচের একজন খেলোয়াড়। বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে নেমে সে প্রাণখোলা আনন্দে খেলায় অংশ নেয়। কেউ কল্পনাও করেনি, সেই মাঠই তার জীবনের শেষ মাঠ হয়ে উঠবে।
খেলা শেষ হওয়ার পর মাঠের অস্থায়ী আলোকসজ্জার বিদ্যুতের সংযোগ খুলতে এগিয়ে যায় সাঈদ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাঠে আলো জ্বালানোর জন্য যে বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছিল, তা ছিল অস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ। সংযোগ খুলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত সাঈদ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। মুহূর্তেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। উপস্থিত সবাই প্রথমে বুঝতেই পারেননি কী ঘটেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সাঈদকে উদ্ধার করে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরিবারের সদস্যরাও খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে তখন কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। অল্প বয়সে একটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
নিহত সাঈদ হোসেন ছিল পরিবারের একমাত্র কিশোর সন্তান। স্থানীয়রা জানান, সে অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত ও মেধাবী ছাত্র ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও তার আগ্রহ ছিল প্রবল। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, সাঈদ নিয়মিত স্কুলে যেত এবং শিক্ষক-সহপাঠীদের কাছে ছিল প্রিয় মুখ। তার এমন অকালমৃত্যুতে পরিবার যেমন ভেঙে পড়েছে, তেমনি পুরো গ্রামেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদুর রহমান বলেন, “খেলাটা ছিল খুবই আকর্ষণীয়। গ্রামের সবাই আনন্দ করছিল। খেলা শেষ হওয়ার পর এমন দুর্ঘটনা ঘটবে, সেটা কেউ ভাবতেও পারেনি। সাঈদ ছিল খুব ভালো মনের ছেলে। তার মৃত্যুতে আমরা সবাই বাক্রুদ্ধ।” তাঁর কণ্ঠে তখনও শোক আর বিস্ময়ের সুর স্পষ্ট।
সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, অসাবধানতাবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে যায় এবং নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হাসপাতাল থেকেই পরিবারের সদস্যরা লাশ বাড়িতে নিয়ে যান।
এই দুর্ঘটনা আবারও গ্রামাঞ্চলে অস্থায়ী বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহারের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয়দের মতে, খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনেক সময় অদক্ষভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হয়, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কিশোরদের মধ্যে বিদ্যুৎ সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব থাকায় এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
ফেনী জেলার বিভিন্ন এলাকায় আগেও এমন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানান। বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত লোকের সহায়তা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি শিশু ও কিশোরদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা দরকার।
সাঈদের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্যই গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার রাত থেকে সাতবাড়িয়া গ্রামে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। আনন্দের খেলার মাঠ রাতের আঁধারে পরিণত হয় শোকস্তব্ধ এক প্রাঙ্গণে। আজও অনেকের মুখে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—সামান্য একটু সতর্কতা থাকলে কি এই প্রাণটি বাঁচানো যেত না?
একটি সম্ভাবনাময় জীবন এমন করুণভাবে থেমে যাওয়ায় স্থানীয় স্কুল, শিক্ষক, বন্ধু ও স্বজনেরা গভীরভাবে শোকাহত। তারা সাঈদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিনোদন ও আনন্দের আয়োজনের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। একটি ছোট অসতর্কতা কীভাবে একটি তরতাজা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, সাঈদের মৃত্যুই তার করুণ উদাহরণ।