চিরবিদায় নিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের নীরব রূপকার বিন্দ্রা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
চিরবিদায় নিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের নীরব রূপকার বিন্দ্রা

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। ভারত ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) সাবেক প্রেসিডেন্ট ইন্দ্রজিত সিং বিন্দ্রা আর নেই। ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভারতীয় ক্রিকেট অঙ্গনে। প্রশাসক হিসেবে যিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, দূরদর্শী এবং নীতিনিষ্ঠ, তাঁর প্রয়াণে শুধু একটি নাম নয়—একটি সময়ের অবসান ঘটল বলেই মনে করছেন ক্রিকেটবোদ্ধারা।

বিন্দ্রা ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই তিন বছরে ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনে তিনি যে ছাপ রেখে গেছেন, তা আজও স্মরণীয়। তবে তাঁর দীর্ঘ ও প্রভাবশালী ভূমিকা বিস্তৃত ছিল মূলত পাঞ্জাব ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে। ১৯৭৮ সালে পাঞ্জাব ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর টানা ৩৬ বছর তিনি এই পদে ছিলেন। ২০১৪ সালে দায়িত্ব ছেড়ে অবসরে যান, কিন্তু ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি।

ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে বিন্দ্রার নাম উচ্চারিত হয় বিশেষ একটি অর্জনের জন্য—ইংল্যান্ডের বাইরে প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজনের পথ সুগম করা। ক্রিকেটে এমন একটি সময় ছিল, যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) বড় টুর্নামেন্ট মানেই ছিল ইংল্যান্ডকেন্দ্রিক আয়োজন। ১৯৭৫, ১৯৭৯ ও ১৯৮৩—প্রথম তিনটি বিশ্বকাপই অনুষ্ঠিত হয় ইংল্যান্ডে। এই দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারা ভাঙে ১৯৮৭ সালে, যখন ভারত ও পাকিস্তান যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের নেপথ্যে যাঁদের অবদান ছিল, তাঁদের মধ্যে বিন্দ্রা ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ।

তৎকালীন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতিতে এটি ছিল একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। অবকাঠামো, আবহাওয়া, দর্শক ব্যবস্থাপনা ও সম্প্রচার—সবকিছু নিয়ে সংশয় ছিল অনেকের। কিন্তু বিন্দ্রা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, উপমহাদেশ ক্রিকেট আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। তাঁর সেই বিশ্বাসই বাস্তবে রূপ নেয় ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপে। শুধু আয়োজন সফলই হয়নি, বরং বিশ্ব ক্রিকেটের কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে ইংল্যান্ড থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে সরে আসার সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে ভারত যে বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তিতে পরিণত হবে, তার ভিত্তি গড়ার ক্ষেত্রে এই আয়োজনকে অনেকে মাইলফলক হিসেবে দেখেন।

পাঞ্জাব ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান হিসেবে বিন্দ্রার অবদান ছিল বহুমাত্রিক। মোহালি ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের ভেন্যু হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই স্টেডিয়াম পরবর্তীতে বহু আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও আইপিএলের গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু হিসেবে পরিচিতি পায়। পাঞ্জাব থেকে জাতীয় দলে খেলোয়াড় উঠে আসার পথ সুগম করতেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রশাসক হিসেবে তিনি বরাবরই জোর দিতেন কাঠামোগত উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর।

বিন্দ্রার নেতৃত্বগুণের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল নীরবতা ও দৃঢ়তা। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন সাহসের সঙ্গে। ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনে যখন নানা মতবিরোধ ও রাজনীতির টানাপোড়েন ছিল, তখনও তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট রাখতেন। তাঁর সহকর্মীরা প্রায়ই বলতেন, বিন্দ্রা ছিলেন এমন একজন প্রশাসক, যিনি ক্রিকেটকে দেখতেন খেলার চেয়েও বড় একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

এই গুণী ক্রিকেট প্রশাসকের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বিসিসিআই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক শোকবার্তায় বোর্ড জানিয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিন্দ্রার মৃত্যুতে বিসিসিআই গভীরভাবে মর্মাহত। এই কঠিন সময়ে তাঁর পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং বোর্ড তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারতীয় ক্রিকেটের বিকাশে বিন্দ্রার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শোক জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) প্রধান জয় শাহও। তিনি এক বার্তায় বলেন, সাবেক বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট এবং ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসনের এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ইন্দ্রজিত সিং বিন্দ্রার প্রয়াণে তিনি গভীর শোকাহত। জয় শাহ উল্লেখ করেন, বিন্দ্রার অবদান শুধু তাঁর সময়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেট প্রশাসকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

বিন্দ্রার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন সাবেক ক্রিকেটার, প্রশাসক ও ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা। অনেকেই স্মরণ করছেন তাঁকে একজন কঠোর কিন্তু ন্যায্য সংগঠক হিসেবে। কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান সময়ে ক্রিকেট যতটা বাণিজ্যিক ও বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে, তার ভিত্তি তৈরির পেছনে বিন্দ্রার মতো প্রশাসকদের অবদান অনস্বীকার্য।

মানবিক দিক থেকেও বিন্দ্রাকে স্মরণ করছেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা। প্রশাসনের কঠোরতা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সহজ ও সংযত। তরুণ খেলোয়াড়দের সুযোগ করে দিতে তিনি ছিলেন আন্তরিক। অনেক খেলোয়াড় পরবর্তীতে বলেছেন, প্রশাসনের উচ্চপদে থেকেও বিন্দ্রা তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং যৌক্তিক দাবি হলে পাশে দাঁড়াতেন।

আজ তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় ক্রিকেট এক অভিভাবককে হারাল। যিনি নীরবে কাজ করে গেছেন, আলোচনার শিরোনাম না হয়েও ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। ক্রিকেট মাঠে হয়তো তাঁর নাম স্কোরবোর্ডে ওঠেনি, কিন্তু ক্রিকেট প্রশাসনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তাঁর ছাপ স্পষ্ট।

ইন্দ্রজিত সিং বিন্দ্রা নেই, কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের কাঠামোতে তাঁর অবদান রয়ে যাবে দীর্ঘদিন। বিশ্বকাপ আয়োজন থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ক্রিকেটের উন্নয়ন—সবখানেই তাঁর চিন্তা ও সিদ্ধান্ত আজও প্রতিধ্বনিত হয়। এই বিদায়ে শোকস্তব্ধ ক্রিকেট বিশ্ব, আর প্রার্থনা একটাই—ভারতীয় ক্রিকেটের এই নীরব রূপকারের আত্মা শান্তিতে থাকুক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত