গুলিতে নিহত নাগরিক, উত্তাল মিনেসোটা: আইসিই সরাতে গভর্নরের আহ্বান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
গুলিতে নিহত নাগরিক, উত্তাল মিনেসোটা: আইসিই সরাতে গভর্নরের আহ্বান

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে ফের বিক্ষোভে উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফেডারেল ইমিগ্রেশন এজেন্টদের গুলিতে আরও এক মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। রাজ্যের রাজধানী মিনিয়াপোলিসসহ বিভিন্ন শহরে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিক্ষোভ। এ পরিস্থিতিতে মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ সরাসরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজ্য থেকে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই’র এজেন্টদের প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

স্থানীয় সময় শনিবার, ২৪ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ চলাকালে ফেডারেল ইমিগ্রেশন এজেন্টদের গুলিতে নিহত হন ৩৭ বছর বয়সী অ্যালেক্স প্রেট্টি। তিনি একজন আইসিইউ নার্স ছিলেন এবং মিনেসোটার বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলার সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ফেডারেল এজেন্টরা গুলি চালায়, এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান প্রেট্টি।

এই ঘটনা মিনেসোটায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চলতি মাসেই এটি রাজ্যটিতে ফেডারেল এজেন্টদের হাতে দ্বিতীয় কোনো মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—অভিবাসন আইন প্রয়োগের নামে নাগরিকদের জীবন কতটা নিরাপদ?

নিহত অ্যালেক্স প্রেট্টি পেশায় একজন আইসিইউ নার্স ছিলেন। স্থানীয় একটি হাসপাতালে তিনি গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সেবা দিতেন। সহকর্মীরা জানান, মানবিক মূল্যবোধ থেকেই তিনি অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দেখা যায়, প্রেট্টি অভিবাসীদের অধিকার ও মানবিক আচরণের পক্ষে নিয়মিত কথা বলতেন। তাঁর মৃত্যুর পর সহকর্মী ও বন্ধুদের শোক আর ক্ষোভ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

ঘটনার পর মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ এক বিবৃতিতে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা ও শান্তিতে বিশ্বাসী মিনেসোটা আর কোনো নাগরিকের রাস্তায় মৃত্যু মেনে নেবে না।” তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজ্য থেকে আইসিই’র প্রায় তিন হাজার এজেন্ট প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। গভর্নরের মতে, ফেডারেল বাহিনীর অতিরিক্ত উপস্থিতি পরিস্থিতিকে শান্ত করার বদলে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।

টিম ওয়ালজ আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “যদি কোনো নাগরিক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়, তাহলে তা শুধু একটি রাজ্যের নয়, পুরো দেশের জন্যই ভয়ংকর বার্তা বহন করে।”

তবে ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকান নেতাদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অভিবাসন সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় আইসিই’র মতো সংস্থার ভূমিকা অপরিহার্য। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম দাবি করেন, “দেশ এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইসিই কর্মীদের প্রয়োজন।” তিনি ডেমোক্র্যাটদের আইসিই’র বাজেট বাতিলের হুমকিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দেন।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘সোশ্যাল ট্রুথ’-এ দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ ও মিনিয়াপোলিসের মেয়র জেকব ফ্রে-কে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, রাজ্যের কারাগারে থাকা সব বন্দিকে ফেডারেল কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া উচিত, যাতে তাদের দ্রুত দেশ থেকে বহিষ্কার করা যায়। ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

এদিকে অ্যালেক্স প্রেট্টির মৃত্যুর প্রতিবাদে মিনিয়াপোলিসসহ আশপাশের এলাকায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, আইসিই এজেন্টরা মিনিয়াপোলিস ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তাদের দাবি, অভিবাসন নীতির নামে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে হবে এবং ফেডারেল বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় সিটি সেন্টারের সামনে আয়োজিত ফেডারেল এজেন্টবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নেন। তারা আইসিইবিরোধী স্লোগান দেন এবং হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে নিহত নার্সের জন্য বিচার দাবি করেন। বিক্ষোভ চলাকালে ওই এলাকার সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী অনেক যানবাহন হর্ন বাজিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, অভিবাসন আইন প্রয়োগের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। এতে শুধু অভিবাসী নয়, মার্কিন নাগরিকরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। সংগঠনগুলোর দাবি, আইসিই’র কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিনেসোটার এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের যুক্তি, অন্যদিকে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন—এই দুইয়ের সংঘাতে দেশটি নতুন করে উত্তাল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নির্বাচনী বছরগুলোতে এমন ঘটনা রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।

সব মিলিয়ে অ্যালেক্স প্রেট্টির মৃত্যু মিনেসোটার রাজনীতিতে যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসন নীতি ও ফেডারেল বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন নির্ভর করছে তদন্তের ফল, কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত এবং রাজ্য ও ফেডারেল কর্তৃপক্ষের পারস্পরিক সমঝোতার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত