প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রকাশ্য ক্ষোভ ঝাড়লেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে তুলে নেওয়ার পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে চাপ, হুমকি ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সমাধানের দায়িত্ব দেশটির জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোরই। বিদেশি শক্তির এমন হস্তক্ষেপ আর গ্রহণযোগ্য নয়।
স্থানীয় সময় রোববার (২৫ জানুয়ারি) ভেনেজুয়েলার পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আনজোতেগুইতে তেল খাতের শ্রমিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং তাকে আটক করে তুলে নেওয়ার পর থেকেই ওয়াশিংটনের দিক থেকে একের পর এক নির্দেশনা আসছে। এসব নির্দেশ ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি।
ডেলসি রদ্রিগেজ তার বক্তব্যে বলেন, “ভেনেজুয়েলার রাজনীতিবিদদের ওপর ওয়াশিংটন থেকে যথেষ্ট আদেশ এসেছে। আমাদের মতপার্থক্য ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আমাদেরই সমাধান করতে দিন। বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ আর নয়, যথেষ্ট হয়েছে।” তার এই বক্তব্যে উপস্থিত শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে এবং অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেন।
এই বক্তব্যের আগে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও হুমকি নিয়ে রদ্রিগেজের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হয়, যা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই ভিডিওতে রদ্রিগেজ দাবি করেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে তুলে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ভেনেজুয়েলার শীর্ষ নেতৃত্বকে মাত্র ১৫ মিনিট সময় দিয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে তাদের শর্ত মেনে না নিলে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
ভিডিওতে রদ্রিগেজকে বলতে শোনা যায়, “প্রেসিডেন্টকে অপহরণের প্রথম মিনিট থেকেই হুমকি শুরু হয়। তারা দিয়োসদাদোকে, হোর্হেকে এবং আমাকে ১৫ মিনিট সময় দিয়েছিল। বলেছিল, এই সময়ের মধ্যে দাবি মেনে না নিলে আমাদের মেরে ফেলা হবে।” তার এই বক্তব্য ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরও উসকে দিয়েছে।
রদ্রিগেজ আরও বলেন, ওই মুহূর্তে তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা। তার ভাষায়, “আমাদের অগ্রাধিকার ছিল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা নয়, বরং দেশটিকে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলার দিকে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করা।”
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের সাত দিন পর ফাঁস হওয়া প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী একটি বৈঠকের ভিডিও প্রকাশ করে স্থানীয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ‘লা ওরা দে ভেনেজুয়েলা’। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মাদুরোকে অপসারণের পর শাসকগোষ্ঠীর অবশিষ্ট সদস্যরা কীভাবে ক্ষমতা পুনর্দখলের কৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন। ভিডিওটি প্রকাশের পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন মাদুরো সরকারকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে আসছিল এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছিল। তবে সরাসরি অভিযান চালিয়ে একজন সাবেক প্রেসিডেন্টকে আটক করে তুলে নেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে দেশটি কেবল রাজনৈতিক চাপেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রয়োজনে সামরিক ও গোপন অভিযানের পথও বেছে নিতে প্রস্তুত। তাদের মতে, এটি শুধু ভেনেজুয়েলার জন্য নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার জন্যই একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের দাবি, মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে। তাই ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এই যুক্তিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে রদ্রিগেজ বলেন, মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের কথা বলে একটি সার্বভৌম দেশের নেতৃত্বকে অপহরণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে দেশটির সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য রক্ষা করা এবং দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন আদায় করা। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থান এখন ভেনেজুয়েলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডেলসি রদ্রিগেজ তার বক্তব্যে তেল শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে তেল খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, “এই সংকটময় সময়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশের সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।”
সব মিলিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে তুলে নেওয়ার ঘটনা এবং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ভেনেজুয়েলার রাজনীতিকে এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। রদ্রিগেজের প্রকাশ্য ক্ষোভ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় এক সংঘাতের অংশ। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে এখন তাকিয়ে লাতিন আমেরিকাসহ গোটা বিশ্ব।