আসামে উচ্ছেদে লক্ষ্য বাঙালি মুসলিমরা: মুখ্যমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৮ বার
আসামে বাঙালি মুসলিম উচ্ছেদ

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, রাজ্য থেকে চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রমে মূলত বাংলাভাষী মুসলিমদেরকে টার্গেট করা হচ্ছে। রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, গোয়াহাটির আশেপাশের পাহাড়ে বসবাসকারী যে কোনো মুসলিম অভিবাসীকেই উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হবে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুধু ‘মিয়া’ হিসেবে পরিচিত বাঙালি মুসলিমদের ওপর কেন্দ্রিত, অন্য কোনো অসমীয়া মুসলিমকে এতে জড়ানো হচ্ছে না।

‘মিয়া’ শব্দটি আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য ব্যবহৃত একটি অবমাননাকর শব্দ। দীর্ঘদিন ধরেই কিছু অ-বাঙালি ভাষাভাষী মানুষ এই শব্দের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। মুখ্যমন্ত্রী শর্মার বক্তব্যে উঠে আসে যে, এই শব্দের ব্যবহার ও উচ্ছেদের নোটিশের মাধ্যমে সরকারি নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও জড়িত থাকতে পারে।

শর্মা সাংবাদিকদের জানান, গোয়াহাটির পাহাড় এলাকায় উচ্ছেদের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, যা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে এমন কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে না। তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন পর্যন্ত যখন একটি উচ্ছেদও হবে না, তখন পাহাড়ে বসবাসকারীরা বুঝবেন যে মিডিয়াই তাদের অকারণে আতঙ্কিত করেছে।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, সরকারি পক্ষের দাবি অনুসারে নির্বাচনকালীন সময়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত থাকবে, যাতে জনমত বা ভোটার উপস্থিতি প্রভাবিত না হয়।

উচ্ছেদের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার পাহাড়ে বসবাসকারীদের ভূমি অধিকার প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তবে একইসাথে তিনি সতর্ক করেন যে, পাহাড়ে বসবাসকারী যে কোনো মুসলিম অভিবাসীকেও উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হতে পারে। শর্মা অভিযোগ করেন, কংগ্রেস দল মুসলিম ভোট তোষণ করছে। তিনি বলেন, কংগ্রেস তাদের দলীয় টিকিটের জন্য ৭৫০টি আবেদন পেয়েছে, যার মধ্যে ৬০০ জনই ‘মিয়া’ এবং মাত্র ১২০-১৩০ জন হিন্দু।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আসামে উচ্ছেদ কার্যক্রম ও বাঙালি মুসলিমদের লক্ষ্য করা রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে অবৈধ অভিবাসী ও নাগরিকত্বের বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭১ সালের পরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের আসাম সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রবেশ এবং বসবাস নিয়ে বহু বছর ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে।

বঙ্গভাষী মুসলিমদের উচ্ছেদ প্রসঙ্গে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নির্বাচনী পূর্বসন্ধ্যায় এই ধরনের বক্তব্য ও নোটিশ জনমনে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে এবং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির বিরুদ্ধ হতে পারে। এছাড়া স্থানীয় অর্থনীতি, শিক্ষাগত প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংহতিও প্রভাবিত হতে পারে।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উচ্ছেদ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মুখ্যমন্ত্রী শর্মার মন্তব্যের সঙ্গে নির্বাচনী কৌশলও জড়িত থাকতে পারে। কারণ ভোটের আগে উচ্ছেদ এবং ভূমি সম্পর্কিত কার্যক্রম স্থানীয় ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সমাজকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীরা জনগণকে শান্তি বজায় রাখতে এবং উচ্ছেদ সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করতে পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা আশঙ্কা করছেন যে, অযথা আতঙ্কিত হলে শিক্ষা, বাণিজ্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ড প্রভাবিত হবে।

এদিকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উচ্ছেদ এবং ভূমি অধিকার নীতি দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা হবে। তিনি বলেন, “যে কোনো বৈধভাবে বসবাসকারী এবং নথি সম্পন্ন ব্যক্তি উচ্ছেদের আওতায় আনা হবে না, তবে যারা বেআইনীভাবে বসবাস করছে তাদেরকেই আইন অনুযায়ী নোটিশ প্রদান করা হবে।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে এই নোটিশ কার্যক্রম সংবেদনশীলভাবে পরিচালিত হবে।

আসামের এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উচ্ছেদ কার্যক্রম এবং বাঙালি মুসলিমদের লক্ষ্য করা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে ভারত সরকার ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজর থাকবে।

এতে স্পষ্ট হচ্ছে যে, আসামে নাগরিকত্ব, ভাষা ও সম্প্রদায়ের পরিচয় নিয়ে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শর্মার মন্তব্য এবং উচ্ছেদ নোটিশের প্রেক্ষাপটকে শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক এবং নির্বাচনী প্রেক্ষাপট থেকেও দেখা হচ্ছে।

বিগত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, ভোটের আগে এই ধরনের কার্যক্রম স্থানীয় জনমনে প্রভাব ফেলে এবং নির্বাচনী ফলাফলের দিকে প্রভাবিত করে। তাই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং উচ্ছেদ নোটিশ কার্যকর করার পদ্ধতিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।

সবমিলিয়ে, আসামে বাংলাভাষী মুসলিম অভিবাসীদের লক্ষ্য করে উচ্ছেদ নীতি, রাজনৈতিক সমীকরণ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার একটি জটিল চিত্র সামনে এনে দিয়েছে। নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনোযোগ দিয়ে দেখছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত