মাদুরো অপহরণে ‘গোপন অস্ত্র’ ব্যবহারের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
মাদুরো অপহরণে ‘গোপন অস্ত্র’ ব্যবহারের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ‘গোপন অস্ত্র’ ব্যবহার করেছে, যা আগে কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা যায়নি—এমন অভিযোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও সোনিক বা শব্দতরঙ্গভিত্তিক অস্ত্র ব্যবহারের দাবি করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের অনেক অংশ এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবু বিষয়টি ইতোমধ্যে বৈশ্বিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে একপ্রকার ‘পরীক্ষাগার’ হিসেবে ব্যবহার করেছে, যেখানে এমন সামরিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে যা আগে কখনও কোনো দেশে ব্যবহার হয়নি। স্থানীয় সংবাদপত্র এল ইউনিভার্সালকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এই অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অত্যাধুনিক অস্ত্রব্যবস্থা একসঙ্গে প্রয়োগ করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার নিরাপত্তা বলয়কে অকার্যকর করে তোলা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির প্রভাব এতটাই ভয়াবহ ছিল যে নিরাপত্তা রক্ষীরা মুহূর্তের মধ্যে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ পাননি।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে অপহরণে যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত রেকর্ডে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযানের সময় শত্রুপক্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অবকাঠামো নিষ্ক্রিয় করতে নতুন প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহার করার নজির রয়েছে। ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এবারের অভিযানেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, তবে তা ছিল আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ও বিপজ্জনক।

এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেই। রোববার নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, অভিযানের সময় একটি বিশেষ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যাকে তিনি ‘ডিসকমবোবুলেটর’ নামে উল্লেখ করেন। যদিও এই অস্ত্রের প্রকৃতি বা কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি, তবে তার বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, এটি প্রচলিত সামরিক সরঞ্জামের বাইরে কিছু। এর আগে মার্কিন নিউজ চ্যানেল নিউজ নেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, সেখানে একটি ‘সোনিক অস্ত্র’ ব্যবহৃত হয়েছে, যা তীব্র শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুকে অক্ষম করে তোলে।

ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো লোপেজ আরও দাবি করেন, কারাকাসে ওই হামলার সময় অন্তত ৪৭ জন ভেনেজুয়েলার সেনা নিহত হন। এছাড়া মাদুরোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত কিউবার ৩২ জন সৈন্যও প্রাণ হারান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই প্রাণহানির তথ্য ভেনেজুয়েলার সরকারিভাবে তুলে ধরা হলেও, আন্তর্জাতিকভাবে এখনো তা সম্পূর্ণভাবে যাচাই হয়নি। তবু এ ধরনের সংখ্যা সামনে আসায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টও বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তিনি এমন কিছু মন্তব্য পুনরায় পোস্ট করেন, যা ভেনেজুয়েলার এক নিরাপত্তা রক্ষীর লেখা বলে দাবি করা হয়। ওই পোস্টে বলা হয়, অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু চালু করেছিল যা অত্যন্ত তীব্র শব্দ তরঙ্গের মতো অনুভূত হয়। লেখক দাবি করেন, হঠাৎ করে তার মাথার ভেতর বিস্ফোরণের মতো অনুভূতি হয়, নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে এবং অনেকেই রক্ত বমি করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তারা নড়াচড়া করতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। যদিও আল জাজিরা জানিয়েছে, তারা এই এক্স অ্যাকাউন্টের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি, তবু ঘটনাটি নিয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প তার বক্তব্যে আরও বলেন, এই অস্ত্র অন্য কোনো দেশের কাছে নেই এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন অনেক অস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর কথা বিশ্ববাসী জানেই না। তিনি দাবি করেন, অভিযানের স্থানটি ছিল একটি দুর্গ ও সামরিক ঘাঁটির মাঝখানে অবস্থিত একটি শক্তিশালী নিরাপত্তাবেষ্টিত ভবন, যা ভেদ করা সহজ ছিল না। তার মতে, এই ‘অবিশ্বাস্য অস্ত্র’ ব্যবহারের মাধ্যমেই সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখানে যে সোনিক অস্ত্রের কথা বলা হচ্ছে, তা হতে পারে দিকনির্দেশনামূলক অ্যাকোস্টিক সিস্টেমের উন্নত সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই দীর্ঘ-পরিসরের অ্যাকোস্টিক ডিভাইস ব্যবহার করে আসছে, যা সাধারণত জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ বা সতর্কবার্তা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে ভেনেজুয়েলার অভিযোগ অনুযায়ী, এবারের প্রযুক্তি ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সরাসরি মানুষের শারীরিক ক্ষতি করতে সক্ষম।

কয়েক সপ্তাহ আগে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘মাদক রাষ্ট্র’ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে এবং সেই কারণেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ভেনেজুয়েলার সরকার এটিকে সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং একে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট পরিপন্থী বলে দাবি করেছে।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার সমালোচনা করেছে, আবার কিছু দেশ নীরব অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপনের সম্ভাবনাও আলোচনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই নতুন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার হয়ে থাকে, তবে তা ভবিষ্যৎ যুদ্ধনীতিতে এক বিপজ্জনক নজির স্থাপন করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন করে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, মাদুরো অপহরণ ও ‘গোপন অস্ত্র’ ব্যবহারের অভিযোগ শুধু ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তথ্যের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে এই ঘটনার মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত