প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বৈশ্বিক বাণিজ্য অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণায়। সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। প্রস্তাবিত এই শুল্ক বৃদ্ধির আওতায় গাড়ি, কাঠ ও ওষুধসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাত অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ট্রাম্পের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে হওয়া আগের বাণিজ্য চুক্তির শর্তাবলি সিউল ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে না।
ট্রাম্প তার পোস্টে সরাসরি দক্ষিণ কোরিয়ার সংসদকে দায়ী করে বলেন, দেশটির আইনসভা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তিটি যথাযথভাবে অনুমোদন ও বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। তার ভাষায়, চুক্তিটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সে কারণেই শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে তিনি বাধ্য হয়েছেন। যদিও তিনি এটিও উল্লেখ করেন, চুক্তি অনুমোদন করা বা না করা দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব সিদ্ধান্ত, তবে এর ফল ভোগ করতেও তাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
এই ঘোষণার পরপরই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় জানায়, শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা সম্পর্কে তারা আগে থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি। হঠাৎ করে এমন ঘোষণায় সিউলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিষয়টি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী কিম জুং-কোয়ান, যিনি তখন কানাডায় অবস্থান করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের সঙ্গে বৈঠকে বসে এই শুল্ক ইস্যুতে আলোচনা করবেন বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কয়েক মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছেছিল। ওই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের অবসান ঘটে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। গত অক্টোবরে ট্রাম্প ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের বৈঠকের পর চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়। এতে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক হ্রাসে সম্মত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ওষুধের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল গাড়ি শিল্পের বিষয়টি। দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ির ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামানো হয়েছিল, যা দেশটির জন্য বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় সেই সিদ্ধান্ত কার্যত বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুল্ক যদি আবার ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে গাড়ি শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ২৭ শতাংশ আসে গাড়ি খাত থেকে, আর এই রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বৃদ্ধি মানেই দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি নির্মাতাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে হুন্দাই, কিয়া সহ বড় বড় কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের পণ্যের দামও বৃদ্ধি পাবে।
শুধু গাড়ি শিল্প নয়, কাঠ ও ওষুধ খাতও শুল্ক বৃদ্ধির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার ওষুধ শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্যতম বড় বাজার। শুল্ক বাড়লে দক্ষিণ কোরিয়ার ওষুধ কোম্পানিগুলো জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়তে পারে। কারণ জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৫ শতাংশ শুল্কের চুক্তি করেছে।
তবে এখনো পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুল্ক বৃদ্ধির কোনো নোটিশ জারি করা হয়নি। ফলে বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক মহল। দক্ষিণ কোরিয়া আশা করছে, আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসতে পারে বা অন্তত শুল্ক বৃদ্ধির সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হবে।
দক্ষিণ কোরিয়াকে লক্ষ্য করে এই হুমকি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বাণিজ্য কৌশলেরই একটি অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর আগে তিনি কানাডাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি দেশটি চীনের সঙ্গে কোনো বড় বাণিজ্য চুক্তি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত দিয়ে আসা সব কানাডীয় পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
এ ছাড়া জানুয়ারির শুরুতে ট্রাম্প ইউরোপের কয়েকটি দেশকে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, যতক্ষণ না তারা গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে রাজি হয়। পরে অবশ্য তিনি সেই হুমকি থেকে সরে আসেন। এসব উদাহরণ দেখিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রায়ই শুল্ককে কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। অনেক ক্ষেত্রে আলোচনার টেবিলে সুবিধা আদায় করাই তার মূল লক্ষ্য।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চুক্তির কিছু শর্ত পুনর্বিবেচনা করতে বা অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করতে চাইছে। শুল্ক বৃদ্ধির হুমকি দিয়ে সিউলের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই হতে পারে এই ঘোষণার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি শুধু দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কেই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এখন নজর সিউল ও ওয়াশিংটনের আসন্ন আলোচনার দিকে। সেই আলোচনার ফলাফলই নির্ধারণ করবে, এই শুল্ক হুমকি বাস্তবে রূপ নেবে নাকি কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তা এড়ানো সম্ভব হবে।