নিরাপত্তা শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ বয়কটের আহ্বান ব্ল্যাটারের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭১ বার
নিরাপত্তা শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ বয়কটের আহ্বান ব্ল্যাটারের

প্রকাশ:  ২৭  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে যখন প্রস্তুতিতে ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা—ঠিক সেই সময়েই বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমর্থকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিরাপদ নয়, ফলে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে সেখানে যাওয়া উচিত হবে না। নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কথা উল্লেখ করে তিনি সরাসরি বিশ্বকাপ বয়কটের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন।

গত সোমবার দেওয়া এক বক্তব্যে ব্ল্যাটার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরের জন্য উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, একটি বিশ্বকাপ শুধু খেলাধুলার উৎসব নয়, এটি নিরাপত্তা, মানবিকতা ও আতিথেয়তারও প্রতীক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতা সেই মানদণ্ড পূরণ করছে না।

দুর্নীতিবিরোধী খ্যাতনামা আইনজীবী ও ফিফার সংস্কার কার্যক্রমের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা মার্ক পিয়েথের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন ব্ল্যাটার। ফিফায় নিজের শাসনামলে নানা সংস্কার উদ্যোগে পিয়েথের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি পিয়েথ যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ থেকে সমর্থকদের দূরে থাকার আহ্বান জানালে সেটিকে ‘সঠিক এবং সাহসী অবস্থান’ বলে মন্তব্য করেন ব্ল্যাটার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্ল্যাটার লেখেন, “আমি মনে করি এই বিশ্বকাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে সঠিক কাজটাই করেছেন মার্ক পিয়েথ।” তাঁর এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ফিফার সাবেক শীর্ষ নেতৃত্বের ভেতরেই বড় ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে।

পিয়েথের এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা। চলতি মাসের শুরুতে মিনিয়াপোলিসে এক আমেরিকান অভিবাসন কর্মকর্তা রেনে গুড নামের এক প্রতিবাদকারীকে হত্যা করেন। এই ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর কিছুদিন পরই অ্যালেক্স প্রেটি নামের এক নার্স যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর্মকর্তাদের গুলিতে নিহত হন। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে পিয়েথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি দমনমূলক আচরণ এবং অভিবাসন সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতনের অভিযোগ বিশ্বকাপ দেখতে আসা সমর্থকদের জন্য উদ্বেগের কারণ। সুইজারল্যান্ডের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা দেশজুড়ে যা দেখছি—রাজনৈতিক বিরোধীদের উপেক্ষা, অভিবাসন সংস্থার অত্যাচার—এসব বিষয় সমর্থকদের সেখানে যাওয়ার জন্য মোটেও উৎসাহিত করে না।”

পিয়েথ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর সমর্থকদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে, কারণ সামান্য ভুল আচরণেই কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের ঝুঁকি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “সমর্থকদের জন্য একটাই পরামর্শ—যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে চলুন। টেলিভিশনে তার চেয়ে ভালোভাবে দেখতে পাবেন।” এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু হবে আগামী ১১ জুন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা—যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে। ফিফার দাবি অনুযায়ী, এটি হবে সবচেয়ে বড় পরিসরের বিশ্বকাপ, যেখানে অংশ নেবে রেকর্ডসংখ্যক দল এবং ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে বিভিন্ন শহরে। তবে আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সেপ ব্ল্যাটারের বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ফিফার সর্বোচ্চ পদে ছিলেন এবং বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক কাঠামোকে কাছ থেকে দেখেছেন। যদিও দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৫ সালে তাঁকে ফিফা সভাপতির পদ ছাড়তে হয়, তবু তাঁর বক্তব্য এখনো বিশ্ব ফুটবলে আলোচনার জন্ম দেয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ব্ল্যাটার ও উয়েফার সাবেক সভাপতি মিশেল প্লাতিনি গত বছর এসব দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি পান।

মিশেল প্লাতিনিও সম্প্রতি ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেন, বর্তমান ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং এর ফলে তিনি “আরও বেশি স্বৈরশাসক” হয়ে উঠেছেন। প্লাতিনির ভাষায়, ইনফান্তিনো এখন মূলত “ধনী ও ক্ষমতাশালীদের পছন্দ করেন”, যা ফিফার নৈতিকতা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্ল্যাটার, পিয়েথ ও প্লাতিনির মন্তব্যগুলো একত্রে ফিফার ভেতরের গভীর মতবিরোধ ও নেতৃত্ব সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, বরং মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও গুরুত্বপূর্ণ—এই বার্তাই তারা দিতে চাইছেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনো এসব মন্তব্যের সরাসরি জবাব দেওয়া হয়নি। তবে আয়োজক কমিটি বারবার দাবি করে আসছে, বিশ্বকাপের সময় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং বিদেশি সমর্থকদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবুও সাবেক ফিফা সভাপতির সরাসরি বয়কট আহ্বান বিশ্বকাপের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা। ফুটবল শুধু মাঠের খেলা নয়, এটি মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ফলে বিশ্বকাপ ঘিরে এমন বিতর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও জোরালো হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত