প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফ্রান্সে শিশু ও কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের দিকে এগোল দেশটির আইনপ্রণেতারা। ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদের নিম্নকক্ষে পাস হয়েছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি এবং অনলাইন আসক্তি থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সোমবার থেকে মঙ্গলবার রাতভর চলা অধিবেশনের পর বিলটি ভোটে গৃহীত হয়, যা দেশটির সামাজিক ও শিক্ষানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে বিলটির পক্ষে বিপুল সমর্থন দেখা যায়। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ১৩০টি, বিপক্ষে ভোট পড়েছে ২১টি। অন্য এক গণনায় দেখা যায়, ১১৬–২৩ ভোটে বিলটির মূল কাঠামো অনুমোদন পান। এই ফলাফল থেকেই স্পষ্ট, রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার প্রশ্নে ফ্রান্সের আইনপ্রণেতাদের বড় একটি অংশ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। এখন বিলটি উচ্চকক্ষ সিনেটে পাঠানো হবে। সেখানে অনুমোদন পেলে এটি আইনে পরিণত হওয়ার পথ সুগম হবে।
বিলটি পাস হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ একে ফ্রান্সের শিশু ও কিশোরদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও শিক্ষাজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি সরকারকে দ্রুত পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করার আহ্বান জানান, যাতে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা যায়। ফ্রান্সে প্রতিবছর ১ সেপ্টেম্বর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। প্রেসিডেন্টের ভাষায়, ‘আমাদের শিশুদের মস্তিষ্ক বিক্রির জন্য নয়।’ এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেলের প্রতিও ইঙ্গিত বহন করে।
বিলটির উদ্যোক্তা সংসদ সদস্য লর মিলার এই উদ্যোগকে সমাজে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানার প্রয়াস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ফরাসি দৈনিক ল্য মঁদকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোকে নিরীহ বা ক্ষতিবিহীন বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ আর নেই। তাঁর মতে, এসব প্ল্যাটফর্ম মানুষকে সংযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে একে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। তথ্য দেওয়ার নামে অতিরিক্ত ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভারে ব্যবহারকারীদের ডুবিয়ে দিচ্ছে এবং বিনোদনের নামে শিশু ও কিশোরদের দীর্ঘ সময় ধরে পর্দার সামনে আটকে রাখছে।
প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোন কোন সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক শিশুদের জন্য ক্ষতিকর—তার একটি তালিকা প্রস্তুত করবে। এই তালিকাভুক্ত নেটওয়ার্কগুলো ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে। অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য আলাদা একটি শ্রেণি নির্ধারণ করা হবে, যেখানে প্রবেশ করতে হলে বাবা-মায়ের স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এর মাধ্যমে পরিবারকে শিশুদের ডিজিটাল অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ। খসড়া আইনে বলা হয়েছে, সিনিয়র স্কুল বা লিসেগুলোতে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে। এর আগে জুনিয়র ও মিডল স্কুলে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তা পুরোপুরি প্রযোজ্য ছিল না। নতুন আইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজনিত বিভ্রান্তি কমানোর আশা করা হচ্ছে।
আইনটি কার্যকর করতে হলে ফ্রান্সকে বয়স যাচাইয়ের একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। দেশটিতে ইতোমধ্যে ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য অনলাইন পর্নোগ্রাফি দেখার ক্ষেত্রে বয়স প্রমাণের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রযুক্তিগত সমাধান খোঁজা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি এখানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ ইউরোপজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ডেনমার্ক, গ্রিস, স্পেন ও আয়ারল্যান্ড ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের কথা ভাবছে। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্য সরকারও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার বিষয়ে জনমত গ্রহণ শুরু করেছে। ফলে ফ্রান্সের এই উদ্যোগ ইউরোপীয় পর্যায়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এই আইনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গত বছরের শেষ দিকে লর মিলারের প্রণীত একটি খসড়ার মাধ্যমে। তিনি টিকটকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্কের মানসিক প্রভাব নিয়ে তদন্তকারী একটি সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব করেছিলেন। সেই কমিটির প্রতিবেদনে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগের ঘাটতি এবং আসক্তির ঝুঁকির বিষয়গুলো বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে সরকারকেও নিজস্ব আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কারণ প্রেসিডেন্ট মাখোঁ তাঁর ক্ষমতার শেষ বছরে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এর আগে ২০২৩ সালে ফ্রান্সে কিশোর-কিশোরীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার একটি আইন প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সেটি ইউরোপীয় আইন লঙ্ঘনকারী হিসেবে আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে যায়। নতুন এই খসড়ায় সেই আইনি সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রেখে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ পেয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বোর্ন রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ফ্রান্স টু-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, বিষয়টি বাস্তবে এতটা সহজ নয়। তাঁর মতে, প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যমান মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না। কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া নতুন আইন প্রত্যাশিত ফল দেবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্ত শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেখানে আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, সেখানে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ফ্রান্স এক সাহসী পথে এগোচ্ছে।