মিয়ানমারে নির্বাচনী জয় দাবি জান্তার, বাড়ছে সহিংসতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৫ বার
মিয়ানমারে সেনা সমর্থিত দলের জয়

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে জয় দাবি করেছে সেনা-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমালোচকদের বড় একটি অংশ এই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হিসেবে মানতে নারাজ। নির্বাচনের দাবিকৃত ফলাফলের পটভূমিতে দেশজুড়ে চলমান সহিংসতা, বেসামরিক মানুষের ওপর আকাশপথে হামলা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি নতুন করে মিয়ানমার সংকটকে বিশ্বজনমতের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর দীর্ঘ পাঁচ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে মিয়ানমার। সেই অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে জান্তা সরকার। রাজধানী নেপিদো ও বাণিজ্যিক শহর মান্দালয়সহ বিভিন্ন এলাকায় তিন ধাপে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জান্তা-সমর্থিত ইউএসডিপি দাবি করেছে, শেষ ধাপের ভোটে তারা নিম্নকক্ষের ৬১টির মধ্যে ৫৭টি আসনে জয় পেয়েছে। তবে একই সঙ্গে স্বীকার করেছে, ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে অন্তত ৬৭টিতে ভোটই হয়নি। এসব এলাকার অধিকাংশই বিরোধী গোষ্ঠী ও সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে আখ্যা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই, সহিংসতা ও দমন-পীড়নের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন নয়। জবাবে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ ভোটই চূড়ান্ত এবং বিদেশি স্বীকৃতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন নন। এই বক্তব্য জান্তা সরকারের আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করার অবস্থানকেই স্পষ্ট করেছে।

নির্বাচনী দাবির সমান্তরালে আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী ও বেসামরিক নাগরিক দমনে সামরিক বাহিনী প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টারের মতো কম খরচে সহজলভ্য উড়োজাহাজ ব্যবহার করছে। এসব উড়োজাহাজ নিচ দিয়ে উড়তে সক্ষম হওয়ায় লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত করা সহজ হচ্ছে, যা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে প্রথম প্যারামোটর হামলার তথ্য পাওয়া যায় এবং ২০২৫ সালের মার্চে প্রথম জাইরোকপ্টার হামলা নথিভুক্ত করা হয়। এসব হামলার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গত বছরের অক্টোবরে সাগাইং অঞ্চলে। সেখানে নির্বাচনবিরোধী এক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে প্যারামোটর থেকে নিক্ষিপ্ত মর্টার শেলে অন্তত ২৪ জন নিহত হন। একই এলাকায় একটি হাসপাতালে জাইরোকপ্টার হামলায় প্রধান চিকিৎসকসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৩৫০টি প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার হামলা হয়েছে। এসব হামলার বড় অংশই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। সাগাইং, ম্যাগওয়ে, মান্দালয়, আয়েওয়ার্দ্দি ও বাগো অঞ্চলকে এই হামলার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় ঘরবাড়ি ধ্বংস, হাসপাতাল ও স্কুলে হামলা এবং সাধারণ মানুষের বাস্তুচ্যুতি নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) জানিয়েছে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত সাত হাজার সাতশ’র বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে। পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষ আটক, নির্যাতিত কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল বারবার সংলাপ ও সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানালেও বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় এবং বড় একটি জনগোষ্ঠী ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না পাওয়ায় ফলাফল জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত করে না। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ভোট হয়নি, সেসব অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার জান্তা প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিকভাবে আরও সন্দেহের মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলো ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোও দ্বিধার মধ্যে রয়েছে। আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার সংকট সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। নির্বাচনী ফলাফলকে কেন্দ্র করে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।

সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। সহিংসতা, খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং বাস্তুচ্যুতির ফলে লাখো মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, সহিংসতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচনী জয় দাবি একদিকে যেমন জান্তা সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নতুন করে উন্মোচিত করেছে। রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে বর্তমান বাস্তবতায় মিয়ানমারের জনগণের সামনে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত