রমজান সামনে রেখে ১ কোটি লিটার সয়াবিন তেল কিনছে সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৪ বার
রমজান সামনে রেখে ১ কোটি লিটার সয়াবিন তেল কিনছে সরকার

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রমজান মাসকে সামনে রেখে ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা ও নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারি উদ্যোগে এক কোটি লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল কেনা হবে, যার জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা। বাজারে সরবরাহ বাড়ানো, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এবং রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে দেশের দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট এক কোটি লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল কেনা হবে। এই তেল প্যাকেজ আকারে সরবরাহ করা হবে এবং তা মোট দশটি লটে বিভক্ত থাকবে। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী পুরো ক্রয়ে সরকারের ব্যয় হবে ১৮৫ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড থেকে কেনা হবে ৫০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল। এই অংশের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯২ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এতে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম পড়বে ১৮৫ টাকা ৯৫ পয়সা। অপরদিকে শবনম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড থেকে টিসিবির জন্য কেনা হবে আরও ৫০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল, যার জন্য মোট ব্যয় হবে ৯২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রতি লিটারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮৫ টাকা ৯০ পয়সা।

বৈঠকে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দর নির্ধারণ করায় এই মূল্যকে তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দামের ওঠানামা, ডলার সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই এই ক্রয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের ধারণা, এই তেল আমদানি ও সংগ্রহের ফলে রমজান মাসে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং সাধারণ ভোক্তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন।

বাংলাদেশে রমজান মাস এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বাড়তি চাপ পড়ে। বিশেষ করে সয়াবিন তেল, চিনি, ডাল ও ছোলার মতো পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। সরকারিভাবে বড় পরিসরে সয়াবিন তেল কেনার সিদ্ধান্তকে সেই প্রবণতা মোকাবিলার একটি কৌশল হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির মাধ্যমে এই সয়াবিন তেল বাজারে সরবরাহ করা হবে বলে জানা গেছে। টিসিবির ট্রাকসেল ও নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে সীমিত আয়ের মানুষ তুলনামূলক কম দামে এই তেল কিনতে পারবেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমজানজুড়ে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে তেলের বিতরণ কার্যক্রম তদারকি করা হবে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সংকট তৈরি না হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উদ্যোগ শুধু ভোক্তাদের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে সরকারের উপস্থিতি থাকলে বেসরকারি ব্যবসায়ীরাও ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে সাহস পায় না। ফলে সরবরাহ ও দামের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি একটি স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সয়াবিন তেল ছাড়াও সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এবং আসন্ন মৌসুমে কৃষকদের প্রয়োজন মেটাতে সার আমদানির বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাদ্য ও কৃষি খাতে সরবরাহ নিশ্চিত করাকে সরকার অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং উৎপাদন ব্যাহত না হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোজ্যতেলের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা বেশ চ্যালেঞ্জিং। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের চাপের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির। এর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের বাজারেও পড়ে। এই বাস্তবতায় সরকারের আগাম প্রস্তুতি এবং বড় পরিসরে ক্রয় সিদ্ধান্ত বাজারের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শুধু ক্রয় সিদ্ধান্তই নয়, বিতরণ ও নজরদারিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় তেল পৌঁছালে তবেই সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবে। একই সঙ্গে তাঁরা বাজার মনিটরিং জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন, যাতে সরকারি তেলের প্রভাব পুরো বাজারে প্রতিফলিত হয়।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, রমজানকে সামনে রেখে এক কোটি লিটার সয়াবিন তেল কেনার সিদ্ধান্ত সরকারের একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রায় ১৮৬ কোটি টাকার এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার বাজারে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায় এবং ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে চায়। এখন দেখার বিষয়, এই তেল কতটা কার্যকরভাবে বাজারে সরবরাহ করা যায় এবং এর মাধ্যমে ভোজ্যতেলের দামে কতটা স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হয়। রমজান মাসের বাজার পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তের সাফল্য বা সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত