রমজান সামনে রেখে ৭১ কোটি টাকায় মসুর ডাল কিনছে সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ বার
রমজান সামনে রেখে ৭১ কোটি টাকায় মসুর ডাল কিনছে সরকার

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন রমজান মাসকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং রমজানকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই ক্রয়ে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় ৭১ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানে ডালের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে, তাই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে মসুর ডাল কেনার এ প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত দরপত্র, অর্থাৎ জাতীয় দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে এই ডাল কেনা হবে। মোট ১০টি লটে, ৫০ কেজির বস্তায় প্যাকেজ করা এই মসুর ডাল সরবরাহ করা হবে।

অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকার কেবিসি অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে এই ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনা হবে। এতে সরকারের মোট খরচ হবে ৭০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ টাকা ৯৬ পয়সা। দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দামের ভিত্তিতেই এই মূল্য চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে রমজান মাস এলেই ডাল, তেল, চিনি, ছোলা ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং ভোক্তারা বিপাকে পড়েন। সরকারিভাবে বড় পরিসরে মসুর ডাল কেনার এই উদ্যোগকে সেই ঝুঁকি মোকাবিলার একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই মসুর ডাল মূলত ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। টিসিবির ট্রাকসেল ও নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষ তুলনামূলক কম দামে এই ডাল কিনতে পারবেন। এতে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং খোলা বাজারেও ডালের দামে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যখন সরাসরি বাজারে পণ্য সরবরাহে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তখন তা বেসরকারি ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি বার্তা দেয়। তারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে পারে না, কারণ সরকারি সরবরাহ বাজারে একটি বিকল্প তৈরি করে। ফলে সামগ্রিকভাবে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ভোক্তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পান। মসুর ডাল যেহেতু বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদান, তাই এর দাম সহনীয় রাখা সামাজিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে শুধু মসুর ডালই নয়, সয়াবিন তেল ও সার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সরকার রমজান ও আসন্ন কৃষি মৌসুমকে সামনে রেখে খাদ্য ও কৃষি খাতের সরবরাহ নিশ্চিতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একদিকে যেমন ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন সচল রাখাও সরকারের অগ্রাধিকার।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনা দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে এসে পড়ে। এই বাস্তবতায় সরকারের আগাম ক্রয় ও মজুত গড়ে তোলার কৌশল বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও সরকারের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তারা বলছেন, শুধু ক্রয় সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে পণ্য বিতরণ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সময়মতো পণ্য পান না। তাই এবার নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মসুর ডাল বিতরণের পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা মজুতদারি যেন না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, রমজানকে সামনে রেখে ১০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল কেনার সিদ্ধান্ত সরকারের একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। প্রায় ৭১ কোটি টাকার এই ক্রয় কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকার বাজারে সরবরাহ বাড়াতে এবং নিত্যপণ্যের দামে স্থিতিশীলতা আনতে চায়। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়ন। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকির মাধ্যমে যদি মসুর ডাল সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছানো যায়, তাহলে রমজান মাসে ডালের বাজারে স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও এখন সেদিকেই—সরকারি উদ্যোগের বাস্তব সুফল যেন তারা সরাসরি অনুভব করতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত